
মো. ইয়াসিন (৩২) প্রতিবছর তরমুজ চাষ করেন। এবার তিনি তিন কানি জমি (সাড়ে চার একর) বন্ধক নিয়ে তরমুজ আবাদ করেন। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ এবং স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করেছেন। তিনি আশা করেছিলেন, তরমুজ চাষে বেশ ভালোই লাভ হবে। কিন্তু পরিবহন ও ক্রেতাসংকটে সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী গ্রামে ইয়াসিনের বাড়ি। তাঁর খেতে বিক্রির উপযোগী হাজারো তরমুজ পড়ে আছে। ব্যবসায়ী না আসায় সেগুলো বিক্রি হচ্ছে না। এর মধ্যে টানা দুই দিনের মাঝারি বৃষ্টিতে খেতে পানি জমে তরমুজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখন লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তোলা নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
আক্ষেপের সুরে ইয়াসিন বলেন, ‘বৃষ্টি না হলে আমার খেতের তরমুজ ১২-১৫ লাখ টাকায় বিক্রি হতো। কীভাবে ঋণের টাকা শোধ করব জানি না। প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকার কিস্তি দিতে হয়।’
ইয়াসিনের মতো উপজেলার শত শত তরমুজ চাষি একই সংকটে পড়েছেন। বড় ব্যবসায়ীরা খেত থেকে তরমুজ কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেন। কিন্তু এ বছর জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে তাঁরা তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ট্রাকভাড়া ৩৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা আসছেন না। এর মধ্যে খেতে বৃষ্টির পানি জমে তরমুজ নষ্ট ও গাছ মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমি সদর উপজেলায়। এখনো জেলায় তরমুজের বেচাকেনা শুরু হয়নি। টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সদর উপজেলার লাকুরতলা, লতাকাটা, বানাই ও পরীরখাল এলাকায় দেখা গেছে, চাষিরা শ্যালোমেশিন দিয়ে খেত থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন। কেউ নালা কেটে পানি নামাচ্ছেন, কেউ পানিতে ডুবে থাকা তরমুজ তুলে শুকনা স্থানে রাখছেন।
লাকুরতলা গ্রামের চাষি আবদুর রব মিয়া বলেন, ‘দুই ভাই মিলে ছয় একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় তরমুজ বিক্রি করতে পারছি না। বৃষ্টিতে খেত ডুবে গিয়ে তরমুজ নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে খরচও উঠবে না।’
একই গ্রামের আরেক চাষি হারুন মিয়া বলেন, দুই দিনের বৃষ্টিতে খেত পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। মেশিন দিয়ে পানি সরিয়েছি। পানিতে ডোবা তরমুজ ব্যবসায়ীরা কিনতে চান না। আগে বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে তরমুজ কিনে নিয়ে যেতেন, কিন্তু এবার জ্বালানিসংকটের কারণে তাঁরা আসছেন না। তিন কানি জমিতে তিন লাখ টাকা খরচ করেছেন। এখন এর উৎপাদন খরচ তোলাই অনিশ্চিত। তাঁর খেতে প্রায় ১৩ হাজার তরমুজ পড়ে আছে।
বরগুনা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে তরমুজের আংশিক ক্ষতির আশঙ্কা আছে। আগামী দুই দিন বৃষ্টি না হলে ক্ষতি কম হবে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে দ্রুত খেতের পানি সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।