সুনামগঞ্জ জেলার মানচিত্র
সুনামগঞ্জ জেলার মানচিত্র

কোটি টাকা চাঁদা দাবি

সুনামগঞ্জের এমপি নূরুল বললেন, অনিয়ম ঢাকতেই মিথ্যা অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার

সুনামগঞ্জ–৪ (সদর–বিশ্বম্ভরপুর) আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম ও তাঁর অনুসারী নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন এক ঠিকাদার। গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। অভিযোগে পুলিশি হয়রানি, পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সরকারি উন্নয়ন কাজে বাধা দেওয়ার কথা বলেছেন ওই ঠিকাদার।

এদিকে আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও এলাকাবাসীকে নিয়ে সড়কের কাজ পরিদর্শন করেছেন সংসদ সদস্য (এমপি) নূরুল ইসলাম। এ সময় তিনি তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তদন্তের দাবি জানান।

নূরুল ইসলাম জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। ঠিকাদারের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার একটি সড়ক সংস্কার ও সেতু নির্মাণের কাজ করছেন ওই ঠিকাদার। এলাকাবাসী শুরু থেকেই কাজে নানা অনিয়মের অভিযোগ করছিলেন। গতকাল ওই এলাকায় গেলে এলাকাবাসী আবার অভিযোগ করেন। পরে তিনি ঠিকাদারের লোকজনকে বলে আসেন, কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। এরপর শহরে ফিরে শোনেন, ওই ঠিকাদার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।

আমি বলেছি, কোনো অনিয়ম করা যাবে না। এখন নিজের অনিয়ম ঢাকতেই মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।
নূরুল ইসলাম, সংসদ সদস্য, সুনামগঞ্জ–৪

অভিযোগকারী ঠিকাদারের নাম মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাসিন্দা। ইসলাম ট্রেডার্স নামে তাঁর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আছে। তিনি জানান, সুনামগঞ্জ–বিশ্বম্ভরপুর সড়কের চারটি সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক উঁচু করা, পাশে ব্লক বসানো ও গাইড ওয়াল নির্মাণ এবং একটি সেতু নির্মাণের কাজ করছেন তিনি। দুটি প্যাকেজে প্রায় ৯৬ কোটি টাকার কাজ করাচ্ছে সওজ।

মো. শফিকুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কাজে কোনো অনিয়ম বা ত্রুটি হলে সেটা সওজ দেখবে। কিন্তু তাঁরা (সংসদ সদস্য ও তাঁর অনুসারীরা) দাবি করা টাকা না পেয়ে কাজে বাধা দিচ্ছেন; আমাকে হুমকি দিচ্ছেন। আমি ভয়ে এমপির সঙ্গে দেখা করিনি। তবে কয়েকবার ফোন দিয়েছি, কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। আমি বাধ্য হয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযোগ করেছি।’

লিখিত অভিযোগে নিজেকে অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন শফিকুল ইসলাম। লিখিত অভিযোগে তিনি বলেন, একজন সাধারণ ঠিকাদার হয়ে সংসদ সদস্য ও কথিত সহযোগী সদস্যদের দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে তিনি চাঁদা দাবি, হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। টাকা না দেওয়ায় তাঁকে নানাভাবে চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তিনি ও তাঁর পরিবার নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আছে।

সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের সংস্কার কাজ দেখছেন সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম। গত মঙ্গলবার বিকেলে সড়কের লালপুর এলাকায়

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনের সড়কে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের একটি মিছিলের ঘটনায় পরদিন সদর থানায় একটি মামলা হয়। সেই মামলায় তাঁকে (শফিকুল) আসামি করা হয়েছে। কিন্তু ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এর আগে জামালগঞ্জ উপজেলার একটি জলমহালে মাছ চুরির মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। সদর থানার মামলায় তাঁকে ধরতে ২১ অক্টোবর রাতে তাঁর সিলেটের বাসায় তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ সময় তাঁর স্ত্রীকে হুমকি দেওয়া হয়।

আমার কাজে কোনো অনিয়ম বা ত্রুটি হলে সেটা সওজ দেখবে। কিন্তু তাঁরা (সংসদ সদস্য ও তাঁর অনুসারীরা) দাবি করা টাকা না পেয়ে কাজে বাধা দিচ্ছেন; আমাকে হুমকি দিচ্ছেন।
মো. শফিকুল ইসলাম, ঠিকাদার

অভিযোগে শফিকুল ইসলাম বলেন, ২০ অক্টোবর সকাল ও বিকেলে দুবার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা–১ সেতু নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া হয়। সেখানে সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তখন তাঁর লোকজনকে গালাগাল করে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে রাতে পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান ফোন করে তাঁকে সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসানও ফোনে তাঁকে একাধিকবার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

তবে জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান হুমকি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কখনো ওনাকে (শফিকুল) ফোন দিইনি।’

সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই সড়ক আমার নির্বাচনী এলাকাসহ তিন উপজেলায় যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। কিন্তু কাজ শেষের আগেই সড়কের পাশে গাইড ওয়াল ধসে গেছে। মাটি দিয়ে তা ঢেকে রেখেছিলেন ঠিকাদারের লোকজন। এলাকার বহু লোক সেখানে ছিলেন। আমি বলেছি, কোনো অনিয়ম করা যাবে না। এখন নিজের অনিয়ম ঢাকতেই মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।’

প্রকৌশলীকে নিয়ে সড়কের কাজ দেখলেন সংসদ সদস্য

সড়কের সংস্কারকাজ পরিদর্শন করছেন সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম ও সওজের কর্মকর্তারা। বুধবার সকালে সড়কের সালামপুর এলাকায়

এদিকে আজ বেলা ১১টার দিকে সওজের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও এলাকাবাসীকে নিয়ে সড়কের কাজ পরিদর্শন করেছেন সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম। কাজ দেখার পর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েকটি সেতু, সড়কের অ্যাপ্রোচ মিলে এই কাজ। কাজটি নকশা অনুযায়ী হচ্ছে। তবে এমপি যে অভিযোগ করেছেন, সেটা ঠিক আছে। আর যাতে কোনো ত্রুটি না হয়, সেটি আমরা দেখব।’

এ সময় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওই ঠিকাদার আজ আসেননি। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ঠিকাদার দেশে নেই। বিগত আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময়ের একটা সিন্ডিকেট এখানে কাজ করছে। আমি চাই, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটির তদন্ত হোক। আমি এলাকাবাসীর স্বার্থে কোনো কাজেই অনিয়ম সহ্য করব না।’