
‘বাবার মৃত্যুর পর সন্তানেরা লাশের খাটিয়া বহন করবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাবা হয়ে সন্তানের লাশের খাটিয়া বহন করা কত যে কঠিন, তা বলে বোঝানো যাবে না। যে বহন করেছে, সেই জানে। কোনো বাবাকে যেন আমার মতো সন্তানের লাশ বহন করতে না হয়, সেটাই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা।’
খুলনায় পিটিয়ে হত্যার শিকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমল হোসেনের বাবা কুতুব উদ্দিন এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন। তাঁদের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার তিতুদহ ইউনিয়নের বড়শলুয়া গ্রামে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল শনিবার রাতে তাঁকে নিজ গ্রামে দাফন করা হয়।
গত শুক্রবার দিবাগত রাতে চুরির অভিযোগ তুলে আজমলকে খুলনায় তাঁর মেসে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
আজ সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। দুপুরে দর্শনা থানা থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে বড়শলুয়া গ্রামে গিয়ে আজমলের স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। আজমলের বাবা কুতুব উদ্দিন জোহরের নামাজ পড়ে বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরের কবরস্থানে ছেলের কবর জিয়ারত করছিলেন। পরে অশ্রুসজল চোখে কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমার একটাই চাওয়া—মৃত্যুর আগে যেন ছেলের খুনিদের বিচার ও শাস্তি দেখে যেতে পারি। সরকার ও প্রশাসনের কাছে চাওয়া—প্রকৃত অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই ছাড় না পায়।’
আজমলকে নিয়ে কুতুব উদ্দিন জানান, দুই ছেলের মধ্যে আজমল বড়। ছোট ছেলে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আজমল বরিশালের নেছারাবাদ মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করলেও খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। পরে চুয়াডাঙ্গার বড়শলুয়া নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ থেকে গত বছর এইচএসসি পাস করেন। ১২ দিন আগে তিনি খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। ইতিমধ্যে চার থেকে পাঁচ দিন ক্লাস করেছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বাড়িতে এসে পরদিন শুক্রবার খুলনায় ফিরে যান। ওই রাতেই তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
আজমলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মাতম চলছে। বাড়ির উঠানে মরদেহের গোসল করানো চৌকি ও বেশ কয়েকটি চেয়ার ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। কয়েকজন প্রতিবেশী আজমলের মা আসমা খাতুনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কারও সান্ত্বনায় তাঁর আহাজারি থামছে না। কাঁদতে কাঁদতে আসমা বলেন, ‘খুনিরা ছেলের ফোন দিয়ে আমাদের বাড়িতে ফোন করে মিথ্যা চুরির অভিযোগ শোনায় এবং এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তখন ছেলের মারধরের শব্দ ও চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু ছেলেকে মারতে মারতে যে মেরেই ফেলতে পারে, এই বিষয়টি কল্পনাতেই ছিল না।’
নিজের প্রথম সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা এই মা আরও বলেন, ‘আমার ছেলের ইচ্ছা ছিল বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা হবে। সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করে। ছেলের ইচ্ছা পূরণ হোক, সেই স্বপ্ন আমরাও দেখতাম। আমাদের সেই স্বপ্ন যে কফিনবন্দী হয়ে বাড়িতে আসবে—এটা স্বপ্নেও ভাবিনি।’