বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের ফটকে রেলের জায়গা দখল করে চলছে নির্মাণকাজ
বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের ফটকে রেলের জায়গা দখল করে চলছে নির্মাণকাজ

বগুড়ায় রেলের জায়গা ও জলাধার ‘দখল’, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ

বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের সামনে রেল বিভাগের জমি দখল করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কামারগাড়ি রেলগেটের সামনে সাতানি হাউজিং– সংলগ্ন স্থানেও রেলওয়ের জায়গায় টিনের বেড়া দিয়ে জলাধার ভরাট করা হচ্ছে।

সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ মাহফুজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ক্যাম্পাসের সামনে রেললাইনের দুই পাশে প্রায় পুরোটাই দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। বিষয়টি রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তাকে জানানো হলেও এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন, পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জামায়াত ও বিএনপির ঘনিষ্ঠ লোকজন রেল বিভাগের জায়গা দখল করে অবৈধভাবে এসব স্থাপনা তৈরি করছেন।

বগুড়া শহরের কামারগাড়ি রেলগেট থেকে পুরান বগুড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফটক পর্যন্ত রেললাইনের এক পাশে স্টেশন সড়ক এবং অন্য পাশে সরকারি আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাস। কলেজ প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলেজ ক্যাম্পাস ও রেললাইনের মাঝখানে একটি লেক বা জলাধার ছিল। এই জলাধার ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবেও কাজ করেছে। এ কারণে এত দিন কলেজ প্রশাসন ক্যাম্পাসের সামনে নিরাপত্তাপ্রাচীরও দেয়নি। বর্তমানে রেললাইনের দুই ধারে নতুন স্থাপনার নির্মাণ চলছে।

১৬ জানুয়ারি সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের জামিলনগর প্রধান ফটকের সামনে রেললাইনের পাশে বেশ কিছু জায়গা দখল করে সেখানে ইটের দেয়াল তুলে অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণকাজ তত্ত্বাবধান করছেন জামিলনগর এলাকার বাসিন্দা জেমস ইসলাম। এই জায়গায় পৌরসভার পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে এখন দোকানঘর গড়ে উঠছে।

জেমস ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এ জায়গা রেলওয়ের কাছ থেকে লিজ নিয়েছেন জামিলনগর এলাকার সাইফুল ইসলাম। তাঁর হয়ে শুধু নির্মাণকাজ তদারকি করছেন তিনি।

সাইফুল ইসলাম বগুড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জামায়াত–সমর্থিত সাবেক কাউন্সিলর এরশাদুল বারীর বড় ভাই। তবে তিনি নিজে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, তা জানা যায়নি। সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি রেলওয়ের কাছ থেকে এখানে ৬০০ ফুট জায়গা লিজ নিয়েছেন। বিধি মেনেই রেললাইন থেকে ১৫ ফুট দূরত্বে স্থাপনা নির্মাণ করছেন। তাঁর ভাষ্য, এখানে স্থাপনা নির্মাণ হলে কলেজের সৌন্দর্য ও শিক্ষার্থীদের আনাগোনা আরও বাড়বে।

লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, সরকারি আজিজুল হক কলেজের সামনে রেলওয়ের কোনো জায়গা কাউকে ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর জানা নেই। ইজারা দেওয়া হয়ে থাকলেও রেললাইন থেকে ন্যূনতম ২০ ফুট ফাঁকা রেখে স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। জলাধার লিজ দেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কলেজের প্রধান ফটক থেকে পুরান বগুড়া এবং স্টেশনমুখী রেললাইনের দুই পাশে গত কয়েক দিনে কাবাব ঘর, আবদুল্লাহ বিরিয়ানি হাউস, টি-পার্ক, স্বাদ বিলাস রেস্টুরেন্ট, কালাই রুটি ও হাঁসের মাংসের দোকান, জোবায়ের বার্গারসহ সাত-আটটি দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব দোকানে ফাস্ট ফুড, কফি ও বিরিয়ানি বিক্রি হচ্ছে।

কলেজ ক্যাম্পাসের সামনে রেললাইন ঘেঁষে গড়ে ওঠা আবদুল্লাহ বিরিয়ানি হাউসের মালিক আসাদ আল ফারুক দাবি করেন, তিনি আজিজুল হক কলেজের বিবিএর শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জন করতে রেললাইনের পাশে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন। রেল বিভাগ থেকে জায়গা লিজ নেননি। আরেকটি দোকানঘরের মালিক মাহী নামের এক তরুণ বলেন, তিনিও কলেজের স্নাতকের শিক্ষার্থী এবং বেকারত্ব ঘোচাতে রেললাইনের পাশে দোকান খুলেছেন। 

স্থানীয় লোকজন বলেন, বিএনপি ও শ্রমিক দলের কথা বলে কিছু লোক কলেজসংলগ্ন রেললাইনের আরেকটি ফাঁকা জায়গায় বাঁশের খুঁটির সঙ্গে দড়ি টানিয়ে দখলের চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া রেলওয়ে স্টেশনের সামনে রেলের জায়গা দখল করে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দল’ বগুড়া শাখার কার্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী (রক্ষণাবেক্ষণ ও পথ) শিপন আলী বলেন, রেললাইন থেকে ২০ ফুট দূরত্বের ভেতরে গড়ে তোলা সব স্থাপনাই অবৈধ। রেলের জায়গা ইজারা নিলেও ২০ ফুটের মধ্যে স্থাপনা গড়ে তোলা হলে তা উচ্ছেদ করা হবে। 

ভরাট হচ্ছে জলাধার

এদিকে শহরের স্টেশন সড়কের পাশে প্রায় এক একর আয়তনের একটি জলাধার ভরাট করে দখলের চেষ্টা চলছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, জলাধারের পশ্চিম পাশের কিছু অংশ ভরা করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, বিএনপি-জামায়াতের প্রায় ১৫ জন কর্মী-সমর্থক মিলেমিশে জায়গাটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের মধ্যে জামায়াত নেতার ভাই সাইফুল ইসলাম ও বিএনপির স্থানীয় নেতা আবদুল জলিলের নামও উঠে এসেছে। সাইফুল ইসলাম বলেন, তাঁরা রেলওয়ের কাছ থেকে জায়গাটি বাণিজ্যিক ইজারা নিয়েছেন। 

রেলের জলাধার ভরাট বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর বগুড়া জেলা কার্যালয় থেকে রেলওয়ের ব্যবস্থাপক এবং রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় থেকে বগুড়া জেলা প্রশাসককে আলাদা দুটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।