বরিশাল নগরের বিএম কলেজ রোড এলাকার ঐতিহ্যবাহী শংকর মঠ মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পীরা
বরিশাল নগরের বিএম কলেজ রোড এলাকার ঐতিহ্যবাহী শংকর মঠ মণ্ডপে প্রতিমা  তৈরির কাজে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পীরা

পেশা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে প্রতিমাশিল্পীদের

এবার মাটি, পাট, বাঁশ, খড়, চটসহ প্রতিমা তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বাড়তি; কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি প্রতিমাশিল্পীদের পারিশ্রমিক।

এক হাতে মাটি, অন্য হাতে বাঁশের চিকন কাঠি। আঙুলের নিপুণ স্পর্শে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার মুখের অবয়ব। পাশেই কেউ খড়ের কাঠামোয় মাটির প্রলেপ দিচ্ছেন, কেউ ব্যস্ত লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকের শরীরের আকৃতি দিতে। একটু দূরে পড়ে আছে বাঁশ, পাট, নাড়া ও চটের স্তূপ। চারদিকে মাটি, খড় ও ঘামের গন্ধ।

দুর্গাপূজা ঘনিয়ে আসায় দিন-রাত এক করে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পী ও কারিগরেরা। গত মঙ্গলবার রাতে বরিশাল নগরের বিএম কলেজ সড়কের ঐতিহ্যবাহী শংকর মঠ পূজামণ্ডপের চিত্র এটি।

প্রতিমাশিল্পীরা বলছেন, এবার মাটি, পাট, বাঁশ, খড়, চটসহ প্রতিমা তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বাড়তি। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি তাঁদের পারিশ্রমিক। এর ফলে প্রতিমা তৈরি করে খরচ সামলে তাঁদের পেশা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

বরিশাল চকবাজার দুর্গামন্দির কমিটির সভাপতি মৃণাল কান্তি সাহা প্রথম আলাকে বলেন, আর্থিক সংকটে এবার অধিকাংশ মণ্ডপের বাজেট কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রতিমা তৈরির বাজেটেও। সাধারণত ৭০-৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১৫–২০ লাখ টাকা বাজেটে পূজার আয়োজন করা হয়। এবার অধিকাংশ পূজামণ্ডপের বাজেট ৭০-৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩-৪ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বড় বাজেটের পূজা এবার নেই বললেই চলে।

গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিমা তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে; কিন্তু পূজা কমিটিগুলোর বাজেট সে অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে সামান্য লাভ রেখেই কাজ করতে হচ্ছে।
কার্তিক পাল, প্রতিমাশিল্পী

প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খরচ কমাতে তাঁদের কেউ কেউ খাবারের ব্যয়ও কমিয়ে দিয়েছেন। যেসব শিল্পী কাজের সময় আগে তিন বেলা পেট ভরে খেতেন, তাঁদের কেউ এখন দুই বেলা খেয়ে কাজ করছেন। আবার কেউ কোনো দিন এক বেলা ভাত খেয়েও কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিমাশিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা ও পেশাটিকে টিকিয়ে রাখার তাগিদেই এমন পরিস্থিতির মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা।

ফরিদপুরের নগরকান্দা থেকে বরিশাল নগরের শংকর মঠে প্রতিমা তৈরি করতে এসেছেন প্রতিমাশিল্পী কার্তিক পাল। এবার তিনি গতবারের চেয়ে কম পূজামণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন। সব মিলিয়ে ১২টি পূজামণ্ডপে প্রতিমা তৈরি করছেন তিনি। এর মধ্যে বরিশালে ছয়টি, চাঁদপুরে একটি এবং নিজের জেলা ফরিদপুরে পাঁচটি। গত বছর তিনি ১৫টি পূজামণ্ডপে প্রতিমা তৈরি করেছিলেন।

এ বিষয়ে কথা হয় কার্তিক পালের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিমা তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে; কিন্তু পূজা কমিটিগুলোর বাজেট সে অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে সামান্য লাভ রেখেই কাজ করতে হচ্ছে। গত বছর তিনিসহ পাঁচজন মিলে শংকর মঠে প্রতিমা তৈরি করে পেয়েছিলেন এক লাখ টাকা। এবার একই কাজ ৮০ হাজার টাকায় করতে হচ্ছে।

প্রতিমা তৈরিতে বিশেষ ধরনের এঁটেল মাটি লাগে। বাঁশ, খড়, শণ, সুতলি, নাড়া, চট, রংসহ নানা উপকরণ প্রয়োজন হয়। কার্তিক পাল জানান, গত বছর যে মাটির বস্তা (৫০ কেজির) ৩৫০ টাকায় কিনেছিলেন, এবার তা কিনতে হচ্ছে ৫০০ টাকায়। গত বছর পাটের কেজি ছিল ১৬০ টাকা, এবার তা হয়েছে ২২০ টাকা। ৬০ টাকা কেজির চট কিনতে হচ্ছে ৮০ টাকায়। খড় এবার কিনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। বেড়েছে বাঁশের দামও।

মঙ্গলবার রাতে নগরের বিএম কলেজ সড়কের ঐতিহ্যবাহী শংকর মঠ পূজামণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, আলো-আঁধারির মধ্যে একের পর এক প্রতিমার গায়ে মাটির শেষ প্রলেপ বসাচ্ছেন প্রতিমা কারিগরেরা। মণ্ডপের এক পাশে জ্বলছে তীব্র আলো, অন্য পাশে পড়ে আছে মাটির সরঞ্জাম। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে যেন নিশ্বাস ফেলার সময় নেই তাঁদের।

বরিশাল জেলা ও মহানগর পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, এবার মহানগর ও জেলা মিলিয়ে ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর ৬৪০টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছিল।

বাকেরগঞ্জের কলসকাঠির প্রতিমা কারিগর যোগেশ পাল বলেন, প্রতিমাশিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য এখন তাঁরা লাভের কথা খুব একটা ভাবেন না। একটি প্রতিমা তৈরিতে সব খরচ বাদ দেওয়ার পর যে অর্থ থাকে, তা খুব বেশি নয়। পূর্বপুরুষেরা এই কাজ করে আসছেন, তাই তাঁরাও পেশাটি ধরে রেখেছেন। কিন্তু এভাবে পেশাটি টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বরিশাল জেলা ও মহানগর পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, এবার মহানগর ও জেলা মিলিয়ে ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর ৬৪০টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছিল। দুর্গাপূজা ঘিরে ইতিমধ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা করেছে বরিশাল বিভাগীয় কমিশন, পুলিশ কমিশন, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন। এসব সভায় পূজামণ্ডপের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দিরে শেষ মুহূর্তে প্রতিমায় রঙের কাজ চলছে। সদর রোড, বরিশাল নগর

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান চারুকলা বরিশালের সাবেক সভাপতি সুশান্ত ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, মৃৎশিল্পী বা প্রতিমাশিল্পীদের জন্য এই পেশা টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাঁদের উৎসাহ দিতে বরিশাল চারুকলার পক্ষ থেকে প্রতিবছর মৃৎশিল্পী সম্মাননার আয়োজন করা হয়। এবার দুর্গাপূজার ষষ্ঠী ও সপ্তমীর দিন মৃৎশিল্প প্রদর্শনী ও সম্মাননার আয়োজন করা হয়েছে।