রিপন হোসেন। শুক্রবার দুপুরে মির্জাপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে
রিপন হোসেন। শুক্রবার দুপুরে মির্জাপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে

দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন পা, এবার চুরি হলো ব্যবসার পুঁজি, দিশাহারা রিপনের পরিবার

প্রায় ১০ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পা হারান টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের ছলিমনগর গ্রামের রিপন হোসেন (৩৭)। জীবিকার তাগিদে চার বছর আগে শুরু করেন বিকাশে আর্থিক লেনদেনের ব্যবসা। এবার তিনি হারালেন তাঁর সেই ব্যবসার মূলধন।

গত বুধবার গভীর রাতে চোরেরা সিঁধ কেটে আলমারিতে রাখা রিপনের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন নিয়ে গেছে। আয়ের একমাত্র উৎস হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এ ঘটনায় তিনি মির্জাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।

রিপন হোসেন জানান, সংসারে দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। প্রায় ২০ বছর আগে তাঁর বড় বোনের বিয়ে হয়। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তাঁর বাবা আরফান হোসেনকে সাহায্য করতে তিনি মির্জাপুরের গোড়াই শিল্পাঞ্চলের একটি পোশাক কারখানায় অপারেটরের চাকরি নেন। এর মধ্যে তিনি বিয়ে করেন। সংসারে আসে একটি ছেলেসন্তান। প্রায় ১০ বছর আগে ২০১৬ সালের মে মাসের এক রাতে তিনি কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। কারখানার শ্রমিক বহনকারী বাসে ওঠার সময় হঠাৎ বাসটি কারখানার ফটকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এ সময় তিনি রাস্তার পাশে পড়ে গেলে বাসের চাকা তাঁর ডান পায়ের ওপরে উঠে যায়। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে নেন। সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে তাঁকে ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁর ডান পা কেটে ফেলতে হয়।

রিপনের বাবা কৃষক আরফান হোসেন ছেলের দুর্ঘটনার খবর শুনে ঘটনার পরদিন ভোরে বাড়ি থেকে কুমুদিনী হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন। পথে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দেওহাটায় তাঁরও দুর্ঘটনা ঘটে। ছেলের মতো তাঁরও ডান পায়ের ওপর দিয়ে একটি ট্রাকের চাকা চলে যায়। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর ডান পায়ের কিছু অংশ কাটা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে নিলে চিকিসকের পরামর্শে তাঁরও পুরো পা কেটে ফেলা হয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম দুজনেরই পা কেটে ফেলার ঘটনায় সংসারে অভাব নেমে আসে।

ওই ঘটনার প্রায় ছয় মাস পর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে তাঁদের প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া শুরু হয়; কিন্তু ওই ভাতায় তাঁদের সংসার চলছিল না। অভাব ঘোচাতে জমা টাকা দিয়ে রিপন বাড়ির পাশে বিকাশের ব্যবসা শুরু করেন। এর মধ্যে তাঁর সংসারে দ্বিতীয় সন্তান আসে। বিকাশের আয় দিয়ে তাঁদের সংসার কোনো রকমে চলছিল। তবে চুরির কারণে বিপাকে পড়েছে পরিবারটি।

রিপন হোসেন বলেন, ‘দুই কাঁধে ক্রাচ ভর করে চলছি। পা নেই। কৃত্রিম পা লাগানোর চেষ্টা করেছিলাম; কিন্তু পা ছোট হওয়ায় মেডিক্যাল থেকে আনফিট বলা হয়েছে। আরেকটু বেশি থাকলে পা লাগানো যেত। এক পা না থাকলেও এত দিন ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছিলাম; কিন্তু চোরের দল আমার সব নেওয়ার পর এখন সংসারে কীভাবে চালাব, তা বুঝে উঠতে পারছি না। ছয়জনের পরিবার চলবে, নাকি না খেয়ে মরতে হবে, ভেবে পাচ্ছি না।’

মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে টাকা ও মুঠোফোন উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।