নীল আকাশের নিচে সবুজের সমারোহ। গারো পাহাড়ের এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে পর্যটকদের। গত মঙ্গলবার শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী অবকাশকেন্দ্রে
নীল আকাশের নিচে সবুজের সমারোহ। গারো পাহাড়ের এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে পর্যটকদের। গত মঙ্গলবার শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী অবকাশকেন্দ্রে

বিশ্ব পর্যটন দিবস

দূরদূরান্ত থেকে আসেন পর্যটক, দিনের আলো থাকতেই ফিরতে হয়

শেরপুরে গারো পাহাড়ে এখন শীতের আগমন টের পাওয়া যাচ্ছে। ভোরে পাহাড়ি পথে হালকা কুয়াশা যেন চাদর বিছিয়ে রাখছে। দুপাশে শাল-গজারির বন, দূরে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়। কোথাও লেকের শান্ত জল, কোথাও টিলার ঢালে সবুজের সমারোহ। হঠাৎ বন্য হাতির সঙ্গে দেখা হয়েও যেতে পারে।

পাহাড়, বন, সীমান্ত ও বন্য প্রাণীর এমন সমবেত সৌন্দর্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। তবে বেশির ভাগ পর্যটককে দিনের আলো থাকতেই ফিরতে হয়। কারণ, পাহাড়ের কাছাকাছি ছোট একটি রিসোর্ট ছাড়া আর রাতযাপনের ব্যবস্থা নেই। সেখানে থাকার সুযোগ আছে মাত্র নয়জনের। ফলে পাহাড়ে রাতের নীরবতা কিংবা ভোরের কুয়াশায় আচ্ছাদিত পাহাড় দেখা থেকে বঞ্চিত হন বেশির ভাগ পর্যটক।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গারো পাহাড়ে পর্যটন বিকাশের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে। পর্যটকদের আগ্রহও আছে। কিন্তু আবাসন, বিনোদন ব্যবস্থাপনা ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে না ওঠায় এই সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

শেরপুরের পরিবেশবাদী সংগঠন শাইনের নির্বাহী পরিচালক মো. মুগনিউর রহমান বলেন, গারো পাহাড়ে পর্যটনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শুধু হোটেল-মোটেল নির্মাণ নয়, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

এক দিনে কতটা দেখা যায়

শেরপুরের ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ১৯ হাজার একর বনভূমিজুড়ে গারো পাহাড়ের অবস্থান। এখানে গজনী অবকাশকেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক, পানিহাটা-তাড়ানি, রাজার পাহাড়, হরিয়াকোনা, বাবলাকোনা, ছোট গজনী, আগরের বাগান, রাবারবাগান, বারোমারী মিশন, নাকুগাঁও স্থলবন্দরসহ বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান আছে। সীমান্তের ওপারে দেখা যায় ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ও।

গজনী অবকাশকেন্দ্র থেকে সীমান্ত সড়ক ধরে রাজার পাহাড়, হরিয়াকোনা, বাবলাকোনা, ছোট গজনী, আগরের বাগান, বারোমারী মিশন কিংবা নাকুগাঁও এক দিনে ঘুরে দেখা কঠিন। জেলা শহর থেকে গারো পাহাড়ের পর্যটন স্থানগুলোতে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। পর্যটকেরা পাহাড় ঘুরে সন্ধ্যার মধ্যেই আবার শহরে ফিরে আসেন। এর কারণ, থাকার ব্যবস্থা শুধু শহরেই আছে।

ঢাকার একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা এঞ্জেলকা পলিন গমেজ কয়েক দিন আগে গারো পাহাড়ে ঘুরে গেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, থাকা ও নিরাপত্তার ভালো ব্যবস্থা করা গেলে রাঙামাটি ও বান্দরবানের মতো প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ পরিবার নিয়ে এখানেও বেড়াতে আসবেন।

থাকার ব্যবস্থা হলে বদলাতে পারে চিত্র

১৯৯০–এর দশকে গজনী অবকাশকেন্দ্র গড়ে ওঠার পর ধীরে ধীরে শেরপুরের পাহাড়ি এলাকা পর্যটকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে ১৯৯৭ সালে গড়ে ওঠে মধুটিলা ইকোপার্ক।

তবে এ দুটি স্থানে দীর্ঘ সময়েও আধুনিক আবাসন ও বিনোদনের সুবিধা সেভাবে না বাড়ায় পর্যটনের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। মধুটিলায় একটি রেস্টহাউস থাকলেও সেখানে পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ নেই।

পর্যটকদের আবাসন ও নিরাপত্তার সুবিধা বাড়াতে সরকারি উদ্যোগে মোটেল নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান গত ১৯ সেপ্টেম্বর পরিদর্শন করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ফররুখ আহম্মদ। তিনি ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী রাংটিয়া এলাকায় সরকারি প্রায় দুই একর জায়গা পরিদর্শন করেন।

ময়মনসিংহ থেকে পরিবার নিয়ে গারো পাহাড়ে ঘুরতে আসা ব্যবসায়ী মো. জামান আহমেদের সঙ্গে গত মঙ্গলবার কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, ‘দিনের বেলায় গারো পাহাড়ের সীমান্তে কয়েকটি জায়গা ঘুরে খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধা না থাকায় চলে যেতে হচ্ছে। সুন্দর ও নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা থাকলে পরিবার নিয়ে আরও সময় কাটানো যেত।’

গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে এক টিলা থেকে অন্য টিলায় যাতায়াতের জন্য আছে ঝুলন্ত সেতু। শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশকেন্দ্রে

বন্য প্রাণী সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ

গারো পাহাড়ে আছে বন্য হাতির বিচরণক্ষেত্র। পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

বন্য হাতি নিয়ে কাজ করা পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলেছেন, পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে পর্যটকেরা যাতে হাতির চলাচলের এলাকায় ঝুঁকি তৈরি না করেন, এ বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়নের পাশাপাশি হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংরক্ষণ করাও জরুরি।

হাতির জন্য অভয়ারণ্য সৃষ্টিতে বন বিভাগ কাজ করছে বলে জানান শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন। সীমান্তবর্তী অপূর্ব সুন্দর গ্রামগুলো পর্যটনের জন্য আদর্শ স্থান হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের রাতযাপনের জন্য সীমান্ত এলাকায় মোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আবাসনের ব্যবস্থা হলে পর্যটকেরা পরিবার নিয়ে স্বচ্ছন্দে গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।