কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ বাজারে প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে বসেছে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কাতলা মাছের মেলা। মঙ্গলবার সকালে তোলা
কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ বাজারে প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে বসেছে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী কাতলা মাছের মেলা। মঙ্গলবার সকালে তোলা

কুমিল্লায় বসেছে শতবর্ষী কাতলা মাছের মেলা, ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়

কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ বাজারে প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে বসেছে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী কাতলা মাছের মেলা। ঐতিহ্য ধরে রেখে রাজগঞ্জ বাজার ও আশপাশের এক কিলোমিটার সড়কজুড়ে বসেছে মাছের এ মেলা। যদিও এটি মূলত কাতলা মাছের মেলা, তবে অন্যান্য মাছও এখানে বিক্রি হচ্ছে। মেলায় আসা মাছের ৮০ ভাগই কাতলা। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে মঙ্গলবার ভোরে শুরু হওয়া এ মেলা চলবে বুধবার রাত পর্যন্ত। মেলা ঘিরে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নেমেছে রাজগঞ্জ বাজারে।

আজ সকাল ৯টায় রাজগঞ্জ বাজারে ঢুকতেই দেখা গেল, চারদিকে শুধু মাছ আর মাছ। কাতলা মাছে সেজেছে সারি সারি মাছের দোকানগুলো। মূল বাজার ছাড়িয়ে পুরোনো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই ধারে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসেছে মাছের মেলা। একদিকে রাজগঞ্জ ট্রাফিক মোড়, অন্যদিকে নগরের মোগলটুলি এলাকার কুমিল্লা হাইস্কুলের ফটক পর্যন্ত। দূর থেকেই কানে ভেসে আসে বিক্রেতাদের শোরগোল। মেলাজুড়েই ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। বড় আকারের মাছে ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি।

কুমিল্লা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে মাছ নিয়ে আসেন শৌখিন বিক্রেতারা। চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, যশোর, সাতক্ষীরা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ এসেছে। ৩ থেকে ২০ কেজি ওজনের কাতলা মাছ এসেছে মেলায়। উৎপাদন খরচ বাড়ায় দামও গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে আসা বিক্রেতা করিম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার মাছ কম এসেছে। তেলসংকটের কারণে এবার দূরের অনেক ব্যবসায়ী মাছ নিয়ে আসেননি। তবে সকাল থেকেই বেচাকেনা জমজমাট। ভালো লাভ হবে বলে তিনি আশা করছেন।

সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মেলা ঘুরে দেখা গেল গেছে, কোথাও পানির মধ্যে জীবিত কাতলা মাছ রেখে বিক্রি হচ্ছে। আবার কোথাও ডালার মধ্যে মাছ লাফালাফি করছে। বড় বড় কাতলা মাছের সঙ্গে বড় আকারের রুই, মৃগেল ও কার্প মাছ সাজানো। ১৫ থেকে ২০ কেজি ওজনের কাতলা মাছের কেজি সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সর্বনিম্ন ৩ কেজি ওজনের কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা কেজি দরে। আকারভেদে ক্রেতারা দরদাম নির্ধারণ করছেন। বড় আকারের রুই মাছ ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। জীবিত মাছের দাম একটু বেশি।

অমিত কর্মকার নামের একজন ক্রেতা বলেন, মেলায় কুমিল্লার পুকুর-দিঘিতে চাষ হওয়া মাছের চাহিদা বেশি। আকারে খুব বেশি বড় না হলেও স্বাদ ভালো হওয়ায় এ মাছের চাহিদা বেশি স্থানীয় লোকজনের কাছে।

রাজগঞ্জ বাজারে প্রায় ৪৭ বছর ধরে মাছ বিক্রি করেন হাশেম মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই মেলা কুমিল্লার শত বছরের ঐতিহ্য। কয়েক শ মাছ বিক্রেতা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিবছর এখানে মাছ নিয়ে আসেন। তাঁর আগে বাবাও এই বাজারে মাছ বিক্রি করেছেন। দুই দিনে হাজার হাজার কাতলা মাছ বিক্রি হয়।

এটি মূলত কাতলা মাছের মেলা, তবে অন্যান্য মাছও এখানে বিক্রি হচ্ছে। মেলায় আসা মাছের ৮০ ভাগই কাতলা। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে মঙ্গলবার ভোরে শুরু হওয়া এ মেলা চলবে বুধবার রাত পর্যন্ত

জেলার দেবীদ্বার থেকে কাতলা ও রুই মাছ এনেছেন মোহাম্মদ শাহজালাল। প্রতিটি মাছের ওজন আড়াই থেকে চার কেজি। ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে কাতলা মাছ বিক্রি করছেন তিনি। শাহজালাল বলেন, ‘২০ বছর ধরে এই মেলায় কাতলা মাছ বেচতাছি। এর আগে আমার বাপে ও দাদায় এই মেলায় মাছ বেচতেন। এবার ৬০০ কেজি মাছ লইয়া মেলায় আইছি। সকাল আটটা থাইক্কা বেচাবিক্রি শুরু করছি। ভালোই সেল হইতাছে। আশা করতাছি ভালাই লাভ হইব।’

নগরের পুলিশ লাইনস এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বরকত উল্লা মুন্সী মাছ কিনতে মেলায় এসেছেন। তবে এবার মাছের দাম তুলনামূলক বেশি বলে তিনি জানান। বরকত উল্লা মুন্সী বলেন, এই মেলা কুমিল্লার ঐতিহ্য। বৈশাখে অতিথি আপ্যায়ন ও স্বজনদের উপহার দেওয়া হয় কাতলা মাছ। তবে এবার মেলায় মাছের দাম চড়া। গত বছর ৫ কেজির বেশি ওজনের মাছ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা ছিল, এবার সেই মাছ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এবার মাছ কম আসায় দাম বেশি বলে মনে হচ্ছে। এই মেলায় বেশির ভাগই কাতলা মাছ আসে, তাই এটিকে কাতলা মাছের মেলা বলা হয়।

কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর প্রথম আলোকে জানান, এই মাছের মেলা কুমিল্লার ঐতিহ্যের অংশ। তবে ঐতিহ্যবাহী এই মেলা ঠিক কবে শুরু হয়েছিল নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। ধারণা থেকে বলা হয়, মেলার বয়স শত বছরের বেশি। মেলা থেকে বড় মাছ কিনে আত্মীয়স্বজনের বাসায় পাঠানো হয় এবং অনেকে মেলার মাছ দিয়ে অতিথি আপ্যায়নও করেন। একসময় শুধু কাতলা মাছ উঠত। এখন অন্যান্য মাছও আসে। তবে অধিকাংশই কাতলা মাছ। তিনি বলেন, মেলার শুরুর দিনে মুসলিমদের উপস্থিতি বেশি থাকে আর শেষ দিনে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। কারণ, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এক দিন পর পয়লা বৈশাখ পালন করেন।