যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। গতকাল সোমবার নগরের একটি ওয়ার্ডে শীতবস্ত্র বিতরণকালে আনোয়ারুজ্জামানের উপস্থিতিতে এমন মন্তব্য করেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী।
এদিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করে আজ মঙ্গলবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠানো হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, দলীয় প্রধানের এমন কোনো নির্দেশনা মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা পাননি।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মেয়র প্রার্থী হতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাতজন নেতা মাঠে আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজন দলীয় মনোনয়ন পাবেন এত দিন এমনটাই করা হচ্ছিল। সম্প্রতি হঠাৎ গুঞ্জন ওঠে, আনোয়ারুজ্জামান মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাবেন এবং দলীয় প্রধান তাঁকে সে লক্ষ্যে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। নগরজুড়ে ‘আনোয়ারুজ্জামানকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাই’ স্লোগান দিয়ে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে। ফলে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী অপর প্রার্থীদের মধ্যে ‘চাপা ক্ষোভ’ দেখা গেছে। মূলত এরই জের ধরে মহানগর আওয়ামী লীগ আজ গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছে। আর এই মন্তব্য ও বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বলেন, গত ২২ জানুয়ারি সকালে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। ওই দিন হাজারো কর্মী-সমর্থক মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা করে তাঁকে সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরে নিয়ে আসেন। এ সময় স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী এবং সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান অন্যতম। পরে আনোয়ারুজ্জামান দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গেও দেখা করেন। এর পর থেকেই জোরেশোরে আলোচনায় আসে তাঁর নাম।
দেশে ফেরার পর থেকে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী প্রতিদিন সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। গতকাল সোমবার বেলা চারটায় তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাদাটিকর এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে শফিউল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আগামী দিনে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে সংগঠন এবং সিটি করপোরেশন যাতে আরও গতিশীল হয়, গণমুখী হয়, জনগণের জন্য যেন আরও বেশি করে কাজ করতে পারে, আমাদের সেই প্রচেষ্টা ও প্রত্যাশা থাকবে। আমরা সবাই নেত্রীর নির্দেশে এখানে এসেছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী আপনাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।’
শফিউল আলম চৌধুরীর এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের বিরোধিতা করে এক দিন পর আজ মঙ্গলবার মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছেন। এতে বলা হয়, আওয়ামী লীগের ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সিলেট সিটি মেয়র নির্বাচনের মনোনয়ন প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা মহানগর আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রী কিংবা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে পাননি।
সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের শৃঙ্খলাসহ দলীয় ভাবমূর্তি যেন বিনষ্ট না হয় এবং বিভ্রান্তি যাতে ছড়ানো না হয়, এ বিষয়ে বিবৃতিতে সবার প্রতি আহ্বানও জানানো হয়।
যোগাযোগ করলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁরা (মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) যে অভিযোগ এনে বিবৃতি দিয়েছেন, এমন কোনো শব্দ আমার বক্তব্যে ছিল না। সিলেটে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে আমি কোনো বক্তব্যই রাখিনি। আমি বলেছি, আনোয়ারুজ্জামান বন্যা, করোনাসহ মানুষের সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে ছিলেন এবং নেত্রী তাঁকে কাজ করে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। অথচ তাঁরা কেন এমন বিবৃতি দিলেন, বুঝে উঠতে পারছি না।’
২০০২ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত চারবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবার আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ২০২০ সালের ১৫ জুন মারা যান তিনি।
চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ছাড়াও মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী অপর সাত নেতা হলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক এ টি এম এ হাসান ও আজাদুর রহমান আজাদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আরমান আহমদ শিপলু ও সদস্য প্রিন্স সদরুজ্জামান চৌধুরী। তাঁরা নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে নিজেদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।