
লাইনটি নির্মাণ করার সময় ওই সব এলাকায় জনবসতি ছিল না। পরে শহর সম্প্রসারিত হয়েছে। ফাঁকা এলাকাটি আবাসিক হয়েছে।
রাজশাহী নগরের তেরখাদিয়া এলাকায় নিজ জমিতে একটি বাড়ি করতে চান অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা শাহানারা খাতুন। এ জন্য তিনি সাততলা ভবনের নকশা অনুমোদন করিয়ে রেখেছেন। কিন্তু একতলার কাজই শেষ করতে পারেননি। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এলাকার একটি অচল বৈদ্যুতিক লাইন। লাইনটি অপসারণের জন্য আবেদন করেও তিনি কোনো সাড়া পাচ্ছেন না।
এভাবে রাজশাহী নগরের প্রায় আট কিলোমিটার আবাসিক এলাকার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন বিদ্যুতের অচল লাইনটির কারণে। রাজশাহীতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) লিমিটেড সূত্রে জানা গেছে, ৩৩ হাজার ভোল্টের এই রিং লাইন নগরের শালবাগানের বিমান চত্বর এলাকা থেকে তেরখাদিয়া হয়ে হড়গ্রাম এলাকায় চলে গেছে। আশির দশকে লাইনটি নির্মাণ করা হয়। তখন সোর্স লাইনে সমস্যা হলে এই রিং লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। কার্যক্ষমতা হারানোর কারণে সাত-আট বছর আগে এটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। লাইনটি নির্মাণ করার সময় ওই সব এলাকায় জনবসতি ছিল না। পরে শহর সম্প্রসারিত হয়েছে। ফাঁকা এলাকাটি আবাসিক হয়েছে। এখন এই সঞ্চালন লাইনের নিচে যাঁদের জমি রয়েছে, তাঁরা ভবন নির্মাণ করতে পারছেন না।
লাইনটির কোথাও কোথাও উঁচু খুঁটি দেওয়া আছে। ওই সব এলাকায় একতলা ভবন করা গেলেও নিচু এলাকাগুলোতে একতলা ভবনও করা যাচ্ছে না। কারণ, নিচু এলাকাগুলোতে লোকজন আবাসিক ভবন করার জন্য জমি উঁচু করে নিয়েছেন। এর ফলে খুঁটির উচ্চতা গেছে কমে।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে সম্প্রতি অবসরোত্তর ছুটিতে (পিএরএল) যাওয়া শাহানারা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, বাকি জীবনটি রাজশাহীতে নিজের এলাকায় কাটাতে চান। এ জন্য রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে সাততলা ভবনের জন্য নকশা অনুমোদন করিয়েছেন। গত এপ্রিল মাসে কাজ শুরু করার পর জানতে পারেন, তাঁর জমির পাশের একটি জমিতে ভবন নির্মাণের সময় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজন শ্রমিক মারা গেছেন। এরপর আর তিনি কাজ শুরু করার সাহস পাননি। লাইনটি অপসারণের জন্য গত ৩১ মে নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩–এর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর আবেদন করেন। প্রয়োজনে লাইনটি অপসারণের খরচ বহন করার কথাও জানান। এরপরও লাইন সরানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
গত সোমবার নগরের তেরখাদিয়া এলাকায় এই সঞ্চালন লাইন দেখতে গেলে ভুক্তভোগী অনেক মানুষ জড়ো হন। তাঁরা বলেন, এই অচল লাইন তাঁদের জীবন অচল করে রেখেছে। এটার কারণে তাঁরা কেউ নিজের জমিতে বাড়ি করতে পারছেন না। লাইন সরানোর আবেদন জানিয়েও কাজ হচ্ছে না।
পৈতৃক সূত্রে প্রায় এক কাঠা জমি পেয়েছেন স্থানীয় রংমিস্ত্রি হুমায়ূন কবির। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সঞ্চালন লাইন তাঁর ঘরের টিনের চালার সঙ্গে প্রায় ঠেকে রয়েছে। এ জন্য তিনি ভবন নির্মাণ করতে পারছেন না।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, শুধু আবাসিক ভবন নয়, অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজও আটকে আছে। তেরখাদিয়া কলেজপাড়া জামে মসজিদের একেবারে ছাদের সঙ্গে লাইনের তার ঠেকে রয়েছে। তাঁরা মসজিদটি বহুতল করতে পারছেন না। এ ছাড়া তেরখাদিয়া উত্তরপাড়া জামে মসজিদ, তেরখাদিয়া মসজিদে আনাম জামে মসজিদসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।
এ সময় এক ব্যক্তি বলেন, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক আতাউর রহমান বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। তখন একজন শ্রমিক এই তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। ওই সময় লাইনটি সচল ছিল। পরে এটি বন্ধ করে দেওয়া হলেও লাইনের আশপাশে কেউ কাজ করাতে সাহস পাচ্ছেন না।
জানতে চাইলে নেসকো লিমিটেডের রাজশাহী অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, অচল লাইনটির বিকল্প হিসেবে জনবসতি না থাকা এলাকা দিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে আরেকটি রিং লাইন নির্মাণের কাজ করছে রাজশাহী বিভাগ। ২০২৩ সালের দিকে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা। এরপর পুরোনো লাইনটি অপসারণ করা হবে।