
গাছের কাণ্ডে পোকার আক্রমণ সাধারণত ক্ষতির কারণ। কিন্তু আগরগাছের ক্ষেত্রে সেই ক্ষতই একসময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রায় দুই দশক আগে শেরপুরের গারো পাহাড়ে রোপণ করা আগরগাছগুলো এখন সুগন্ধি উৎপাদনের উপযোগী হয়েছে। জেলার প্রথম বাণিজ্যিক আগরবাগানটি এবার দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করতে যাচ্ছে বন বিভাগ।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের উদ্যোগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া রেঞ্জের গজনী বিটের ছোটগজনীতে ১০০ একর বনভূমিতে প্রায় ৮০ হাজার আগরের চারা রোপণ করা হয়। পরে ২০১০-১১ অর্থবছরে শ্রীবরদী উপজেলার বালিঝুড়ি রেঞ্জের মালাকুচা বিটের ঝুলগাঁও এলাকায় আরও ৪০ একর বনভূমিতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার আগরের চারা লাগানো হয়।
এর মধ্যে ছোটগজনীর বাগানটির বয়স এখন ১৯ বছর। বন বিভাগ বলছে, গাছগুলো সুগন্ধি উৎপাদনের উপযোগী হয়ে উঠেছে। তাই আটটি প্লটের এই বাগান দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। ক্রেতা প্রতিষ্ঠান গাছ কেটে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য দুই বছর সময় পাবে। বিক্রয়ের ৪৫ শতাংশ পাবেন বাগানের পরিচর্যায় যুক্ত ৮০ জন স্থানীয় অংশীজন।
আগরগাছ থেকে মানসম্মত সুগন্ধি পেতে সাধারণত প্রায় ২০ বছর সময় লাগে। ছোটগজনীর ১০০ একরের বাগানটি এখন পরিপক্ব।এস বি তানভীর আহমদ ইমন, সহকারী বন সংরক্ষক, ময়মনসিংহ বন বিভাগ
বর্তমান রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল করিম, যিনি শুরুতে এই বাগান প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে ছিলেন। প্রথম আলোকে তিনি জানান, এটি জেলার প্রথম আগরবাগান। বিভিন্ন স্থান থেকে বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদন করা হয়েছিল। এখন দরপত্রের মাধ্যমে বাগান বিক্রি করা হবে। ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তিন কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ পাবে এবং গাছ কেটে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য দুই বছর সময় দেওয়া হবে। আগর অত্যন্ত মূল্যবান গাছ।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগরগাছে প্রাকৃতিকভাবে বিটল পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণ হলে গাছ আত্মরক্ষার জন্য রজন তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে সেই রজন কাঠের ভেতরে জমে কালচে ও সুগন্ধিযুক্ত অংশে পরিণত হয়। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে।
প্রতিবছর আগাছা পরিষ্কার করেছি, রাতে পাহারা দিয়েছি। এখন গাছ পরিপক্ব হয়েছে। বাগান বিক্রি হলে আমাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে।ফিলিসন কুবি, ছোটগজনী গ্রামের অংশীজন
বাণিজ্যিকভাবে সুগন্ধি উৎপাদনের জন্য এবার গাছে পেরেক ঢোকানো হবে না। বরং বিশেষ একটি পদার্থ প্রয়োগ করা হবে, যা ছত্রাকের আক্রমণ সৃষ্টি করবে। এরপর গাছে রজন তৈরি হবে। সেই কাঠ সংগ্রহ করে পাতন প্রক্রিয়ায় আগর তেল বা আতর উৎপাদন করা হবে। যেসব গাছে পর্যাপ্ত রজন তৈরি হয় না, সেগুলোর কাঠ থেকেও সুগন্ধি উৎপাদন করা যায়। তবে সেই সুগন্ধির মান তুলনামূলক কম।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগরের বীজ সংগ্রহ করে ৬০ থেকে ৭০ হাজার চারা উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি সিলেট থেকে আরও প্রায় ১০ হাজার চারা এনে রোপণ করা হয়। এরপর ৮০ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে নিয়ে আটটি প্লট গঠন করে বাগান পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯ বছর ধরে পাহারা ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে তাঁরা বাগানটি গড়ে তুলেছেন।
ছোটগজনী গ্রামের অংশীজন ফিলিসন কুবি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চারা লাগানোর পর থেকেই আমরা বাগান পরিচর্যা করছি। প্রতিবছর আগাছা পরিষ্কার করেছি, রাতে পাহারা দিয়েছি। এখন গাছ পরিপক্ব হয়েছে। বাগান বিক্রি হলে আমাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে।’
দুধনই গ্রামের অংশীজন হারুন অর রশিদ বলেন, ‘গারো পাহাড়ে আগে আগরের বাগান ছিল না। বন বিভাগের উদ্যোগে এই বাগান হয়েছে। ১৯ বছর ধরে পরিচর্যা করেছি। এখন বাগান বিক্রি হলে বন বিভাগের পাশাপাশি আমরাও লাভবান হব।’
বন বিভাগ জানায়, আগরগাছ কেটে ছোট ছোট টুকরা করে ১০ থেকে ৩০ দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর বিশেষ চুল্লিতে পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগর তেল সংগ্রহ করা হয়। এই তেল থেকে তৈরি আতরের চাহিদা রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তবে চাহিদার তুলনায় বাংলাদেশ থেকে এখনো কম পরিমাণ আগরজাত পণ্য রপ্তানি হয়।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক এস বি তানভীর আহমদ ইমন প্রথম আলোকে বলেন, আগরগাছ থেকে মানসম্মত সুগন্ধি পেতে সাধারণত প্রায় ২০ বছর সময় লাগে। ছোটগজনীর ১০০ একরের বাগানটি এখন পরিপক্ব। তাই দরপত্রের মাধ্যমে এটি বিক্রি করা হবে। আগরের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই উদ্যোগে বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় অংশীজনেরাও অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন।