বন্য প্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিনের ছোট্ট প্রকোষ্ঠে লেপার্ড দুটির কেটে গেছে প্রায় ৯ বছর। বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় গাজীপুর সাফারি পার্কে
বন্য প্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিনের ছোট্ট প্রকোষ্ঠে লেপার্ড দুটির কেটে গেছে প্রায় ৯ বছর। বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় গাজীপুর সাফারি পার্কে

তিন সপ্তাহ থাকার কথা, কোয়ারেন্টিনেই কেটে গেল দুই লেপার্ডের ৯ বছর

ছোট একটি ঘর। চারদিকে লোহার গ্রিল। সেখানেই কেটে যাচ্ছে দুই লেপার্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময়। গাছে ওঠার সুযোগ নেই, নেই ছুটে বেড়ানোর জায়গা কিংবা শিকার করার স্বাভাবিক পরিবেশ। দর্শনার্থীরাও তাদের দেখতে পান না। অথচ সেখানে থাকার কথা ছিল মাত্র তিন সপ্তাহ।

গাজীপুরের শ্রীপুরে গাজীপুর সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিন শেডে (রোগের সংক্রমণ রোধে আলাদা রাখার স্থান) থাকা দুটি লেপার্ডের জীবনে সেই সাময়িক বন্দিত্ব প্রায় ৯ বছরেও শেষ হয়নি। ২০১৭ সালে দেড় মাস বয়সে উদ্ধারের পর থেকে তারা সেখানেই আছে। এত বছরেও তাদের জন্য তৈরি হয়নি উপযোগী কোনো আবাস।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকায় একটি গাড়ি থেকে দুটি লেপার্ড ও দুটি সিংহশাবক উদ্ধার করে পুলিশ। বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়। পরে চারটি শাবক গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী তাদের কোয়ারেন্টিন শেডে তিন সপ্তাহের জন্য রাখা হয়েছিল। পরে সিংহশাবক দুটিকে সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হলেও লেপার্ডের শাবক দুটিকে সেখানেই রাখা হয়। উদ্ধারের সময় লেপার্ডের একটি শাবকের ওজন ছিল ২ কেজি, অন্যটির ১ কেজি ৬০০ গ্রাম। লেজসহ দৈর্ঘ্য ছিল যথাক্রমে ২৬ ও ২২ ইঞ্চি। তখন বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস। এখন তাদের বয়স প্রায় ৯ বছর।

বৃহস্পতিবার সকালে পার্কে গিয়ে দেখা যায়, লেপার্ড দুটি এখনো সেই কোয়ারেন্টিন শেডের ছোট কক্ষেই আছে। খাবার দেওয়ার সময় একটি কক্ষে তাদের আটকে রাখা হয়। খাবার দেওয়ার পর দরজা খুলে দিলে দুই কক্ষে ঘুরে ঘুরে খাবার খায় তারা। শেডের কাছে মানুষ গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে গ্রিলের ওপর লাফিয়ে ওঠে। কক্ষের জায়গা এতই কম যে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা, লাফানো কিংবা গাছে ওঠার সুযোগ নেই তাদের।

খাঁচার পাশে বসে আছে একটি লেপার্ড। বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুর সাফারি পার্কে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী–বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান প্রথম আলোকে বলেন, নতুন কোনো প্রাণী আনার পর রোগজীবাণু ছড়ানো ঠেকাতে সাধারণত চার সপ্তাহ পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। এরপর উপযোগী জায়গায় স্থানান্তর করা উচিত। দীর্ঘদিন কোয়ারেন্টিনে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাঁর মতে, সাফারি পার্কে প্রাণীদের জন্য তুলনামূলক বড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যবস্থা থাকার কথা। দ্রুত লেপার্ড দুটির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে সেখানে নেওয়া দরকার।

২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাফারি পার্ক পরিদর্শনে এসে লেপার্ড দুটির জন্য আবাসন তৈরির পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর আগেও উচ্চপর্যায় থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে এখনো সেই আবাসন তৈরি হয়নি।

খাবার দেওয়ার সময় লেপার্ড দুটিকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুর সাফারি পার্কে

দর্শনার্থী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বাঘ ও সিংহ দেখার সুযোগ থাকলেও লেপার্ড দেখার সুযোগ নেই। ব্যবস্থা করা হলে দর্শনার্থীরা এই প্রাণীটিও দেখার সুযোগ পাবেন।

গাজীপুর সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক ও বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ঢাকার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বলেন, উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় লেপার্ড দুটিকে কোয়ারেন্টিন শেডেই রাখা হয়েছে। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি স্থানটি পরিদর্শন করে গেছে। এ বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করা যায়।