
ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাব হোসেনকে মাদকসেবীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন। ওই ঘটনায় নিহত আলতাব হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুল ইসলাম মারধরে গুরুতর আহত হয়েছেন।
নিহত আলতাব হোসেন (৫৮) এসবির ঢাকার মালিবাগ কার্যালয়ে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার নিয়ে তিনি সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার রূপনাই গাছপাড়ায়।
আহত আরিফুল ইসলাম (২৬) রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাঁর বড় ভাই শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বড়দেশির মদিনা সিটি এলাকায় আমাদের দুই ভাইয়ের একটি ছোট পোশাক কারখানা আছে। কারখানার সবকিছু বাবা দেখাশোনা করতেন। সাদা রঙের একটি প্রাইভেট কারে তারা (হামলাকারীরা) আমাদের ফ্যাক্টরির সামনে দিয়ে প্রতিনিয়ত ঘোরাফেরা করে। অলটাইম প্রাইভেট কারে দেখছি, গেঞ্জি খোলা অবস্থায় সব কটারে। আর সব সময় চার থেকে পাঁচজন থাকত। তারা মাদকসেবী। আমরা তিন বেলা ভাত খাই, ওরা তিন বেলা নেশা করে।’
ওই পোশাক কারখানার কিছুটা দূরে ফাঁকা জায়গা আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, সাভারের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে মাদকসেবীরা আসে। ওই ফাঁকা জায়গায় প্রায় সারা দিনই মাদকসেবীরা আড্ডা দেয়।
নিহত আলতাব হোসেন (৫৮) এসবির ঢাকার মালিবাগ কার্যালয়ে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার নিয়ে তিনি সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
এ ঘটনায় আজ রোববার দুপুরে সাভার মডেল থানায় নিহত আলতাব হোসেনের স্ত্রী শিউলি পারভীন বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে সাভার মডেল থানা–পুলিশ জানায়, গতকাল শনিবার রাতে কারখানাসংলগ্ন একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে মারধর করতে দেখেন নিহত আলতাব হোসেন। রক্ষা করতে গেলে তাঁকেও মারধর করা হয়। মারধরের এক পর্যায়ে দৌড়ে আলতাব হোসেন কারখানার ভেতরে যান। প্রাইভেট কার নিয়ে মারধরকারীরা ওই কারখানার সামনে আসে। এ সময় আরও ৩০ থেকে ৩৫ জন সেখানে গিয়ে কারখানার গেট ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলে। পরে তারা আলতাব ও তাঁর ছেলে আরিফুলকে মারধর করে।
কারখানার দরজা আটকেও রক্ষা পাননি
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল রাতে মুরব্বিকে (গ্যারেজের মালিক কালাম) ওরা মারতেছিল। গাড়ির সাইড নেওয়া নিয়ে ঝামেলা হইছিল। ওনার (কালামের) অটো গ্যারেজে ঢুকবে, ওদের প্রাইভেট কার বের হবে। আব্বু নিজেকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে থামানোর চেষ্টা করলে তারা আমার বাবাকে মারছে। তিনি দৌড়ে কারখানার ভেতরে যান। সেখানে আরিফুলকে জানান, কয়েকজন মাদকাসক্ত ছেলে তাঁর গায়ে হাত তুলেছে।’
শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এরপর বাবা আর ভাই ফ্যাক্টরি থেকে বের হইছে। প্রাইভেট কারটা আবার সামনে গিয়ে তাদের গায়ের ওপর উঠিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থা করছিল। এই সময় আরও ২০ থেকে ২৫ জন আসছে। এটা দেখে আব্বু আর ছোট ভাই ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকে পড়ছে। ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকে দরজা যেই লাগাবে, সব কটা মিলে দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলছে। ছোট ভাইকে ফেলে দিয়ে আলাউদ্দিন নামের একজন বুকে লাথি দিছে। একজন পেছন থেকে আমার ছোট ভাইকে একটা কিছু দিয়ে বাড়ি মারছে। কিছু একটা দিয়ে আমার বাবাকে হিট (আঘাত) করায় বাবা পড়ে গেছে। পরে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক বাবাকে মৃত ঘোষণা করে। ছোট ভাই হাসপাতালে ভর্তি।’
গ্রেপ্তার মামলার প্রধান আসামি
আজ বেলা দেড়টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন। তিনি বলেন, নিহত আলতাব হোসেনের স্ত্রী শিউলি পারভীন বাদী হয়ে ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন। ইতিমধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গ্রেপ্তার জহিরুল ইসলাম (৩০) সাভারের বড়দেশি এলাকার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে। তিনি ভাড়াচালিত গাড়ির ব্যবসা করেন। গতকাল রাতে সাভারের নামাবাজার এলাকা থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ। আজ দুপুরে দায়ের করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
মরদেহ দাফন করা হবে সিরাজগঞ্জে
আজ বিকেল সাড়ে চারটার দিকে নিহত আলতাবের আত্মীয় মোহসীন আলী জানান, আলতাব হোসেনের মরদেহ নিয়ে তাঁরা সিরাজগঞ্জে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এনায়েতপুর থানার রূপনাই গাছপাড়া গ্রামে মরদেহ দাফন করা হবে। তাঁর ছোট ছেলে আরিফুল ইসলাম চিকিৎসা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে যাচ্ছেন।