
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের সাজেদা খাতুন বাণিজ্যিকভাবে জারবেরা ফুলের চাষ করেন। আগে ভারত থেকে চারা আমদানি করতেন তিনি। এতে খরচ বেশি হতো আবার সময়মতো গাছের চারা দেশে এসে পৌঁছাবে কি না, সেই দুশ্চিন্তাও তাঁর ভেতরে কাজ করত।
সাত বছর আগে ২০১৯ সালের দিকে জানতে পারেন, যশোরের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশন’ (আরআরএফ) থেকে জারবেরা ফুলের চারা সংগ্রহ করা যায়। এতে খরচও কম পড়ে আবার ফুলের উৎপাদনও ভালো।
১৫ বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ করা সাজেদা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, গ্রিন বায়োটেক টিস্যু কালচার ল্যাব নামে আরআরএফের একটি ল্যাব আছে। সেখানে বিভিন্ন জাতের ফুলের চারা বিক্রি করা হয়। ভারত থেকে আনতে যে খরচ পড়ত, তার প্রায় অর্ধেক দামে এখানে চারা পাওয়া যায়। এ ছাড়া ভারত থেকে চারা আনতে হলে অন্তত তিন মাস আগে অর্ডার (আমদানির চাহিদা) দিতে হতো।
সাজেদা খাতুন এখন দুই বিঘা জমিতে ফুলের চাষ করছেন। তাঁর মতো আরও অনেক ফুলচাষির সময় ও অর্থ সাশ্রয় করেছে বেসরকারি সংস্থার এ উদ্যোগ। এখন শুধু যশোরের গদখালী নয়; ঝিনাইদহ, চট্টগ্রাম, সাভার, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার চাষিদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এই ল্যাবের চারা।
বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) যশোরের স্থানীয় মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও আরআরএফের যৌথ অর্থায়নে ২০১৭ সালে যশোরের রাজারহাট এলাকায় এই ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই ল্যাব থেকে ৭ হাজার ১৫০টি চারা (জারবেরা, কারনেশন, কলাগাছসহ অন্যান্য) উৎপাদন করা হয়েছে। আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ল্যাব থেকে মোট ৩৪ হাজার ৫৯৯টি জারবেরা চারা সরবরাহ করা হয়েছে।
বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) কীভাবে সীমান্তবর্তী জেলা যশোরের স্থানীয় মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, এর একটি উদাহরণ ফুলচাষিদের জন্য সাশ্রয়ী দামে চারা সরবরাহ করা। এর পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষা, কৃষি উপকরণ সরবরাহ, ক্ষুদ্রঋণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ সামাজিক সচেতনতায় বেসরকারি সংস্থাগুলোর নানা উদ্যোগ যশোর অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ইকবাল কবির প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা তৈরি ও উদ্যোক্তা তৈরির কাজে ভূমিকা রাখছে বেসরকারি সংস্থাগুলো। তবে যারা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কাজ করে তাদের মধ্যে কোনো কোনো সংস্থার বিরুদ্ধে কখনো কখনো হয়রানি করার অভিযোগও আসে।
যশোর অঞ্চলে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা আরআরএফের উদ্যোগ শুধু ফুলচাষিদের কাছে কম দামে চারা পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, জেলার মহেশপুর এলাকায় আটটি সৌরচালিত সেচপাম্পও স্থাপন করেছে তারা। এর ফলে চাষিরা ডিজেল ও বিদ্যুৎ–চালিত পাম্পের চেয়ে প্রায় অর্ধেক খরচে জমিতে সেচ দিতে পারছেন।
আরআরএফের প্রকল্প কর্মকর্তা অসীত বরণ মণ্ডল বলেন, কৃষকদের এগিয়ে নিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। এরই ধারাবাহিকতায় নিজস্ব ল্যাবে উৎপাদিত চারা নামমাত্র মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা আগে চড়া দামে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এ ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় আসা কৃষকদের সেচ সুবিধার জন্য সৌরচালিত পাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার সুফল পাচ্ছেন শত শত কৃষক।
আলো দেখাচ্ছে ‘শিশুস্বর্গ’
যৌনপল্লি ও হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের সমাজের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে ‘শিশুস্বর্গ’ স্কুল। যৌনপল্লিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাবলম্বী জীবনে ফেরাতে ২০০২ সালে একটি প্রকল্প নেয় বেসরকারি সংস্থা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে এই প্রয়াস আলোর পথ দেখাচ্ছে।
যশোরের যৌনপল্লির শিশু সুমনকে (ছদ্মনাম) সাত বছর বয়সে শিশুস্বর্গ স্কুলে ভর্তি করান তার মা। ২০১০ সালে মাধ্যমিক ও পরবর্তী সময়ে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে সুমন এখন একটি বেসরকারি সংস্থায় দায়িত্বশীল পদে কর্মরত।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কৃষিভিত্তিক ও সৌরচালিত সেচপাম্পের মতো কার্যক্রম প্রশংসনীয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থাগুলো।দেলোয়ার হোসেন, প্রশাসক, যশোর জেলা পরিষদ
যশোর শহরের আরবপুর হরিজনপল্লি এলাকায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শুরুতে দাতা সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত হলেও বর্তমানে এটি জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের নিজস্ব অর্থায়নে চলছে। এ পর্যন্ত ১৫৪ শিশু এখান থেকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। তাদের মধ্যে একজন স্নাতকোত্তর শেষ করে ব্যাংকে কর্মরত এবং তিনজন স্নাতক পাস করেছেন। এ ছাড়া ৩১ জন নারী ও ১৬ জন পুরুষ বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত। অনেকে ড্রাইভিং, ইজিবাইক চালানো, রূপসজ্জার কাজ বা ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এর বাইরে বেসরকারি এই সংস্থার সহায়তায় ৪৬ জন নারী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নতুন সংসার শুরু করেছেন।
জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মেরীনা আখতার বলেন, বর্তমানে আবাসে ২৯ শিশু (৩টি ছেলে ও ২৬টি মেয়ে) অবস্থান করছে। সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর অধিকার নিশ্চিতকরণ ও সামাজিক স্বীকৃতি প্রদানই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।
সালমাদের ঘুরে দাঁড়ানো
ঝিনাইদহের সীমান্তঘেঁষা মহেশপুর উপজেলার জলিলপুর গ্রামের সালমা খাতুন (৩৫) বাড়িতে বসেই ইমিটেশনের গয়না তৈরি করে নিজের ভাগ্য বদলেছেন। এক যুগ আগে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তাঁর বিয়ে হয়। দিনমজুর স্বামীর স্বল্প আয়ে সংসার চলত কষ্টে। পরবর্তী সময়ে ইমিটেশনের গয়না তৈরির কাজ শিখে তা বিক্রি করতে শুরু করেন তিনি।
২০১৪ সালে ‘শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন’ থেকে ঋণ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করেন সালমা। পরে স্বামী মতিয়ার রহমানও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন। গয়না বিক্রির টাকায় তাঁরা জমি কিনে পাকা বাড়ি তৈরি করেছেন, সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন।
নিজের বাড়িতেই ছোট কারখানাও গড়ে তুলেছেন সালমা। সেখানে ৮ থেকে ১০ জন কর্মী প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ জোড়া কানের দুল তৈরি করেন, যা দৈনিক ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
সালমা খাতুন বলেন, ‘শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন আমাকে পথ দেখিয়েছে। অভাবের দিনে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বিনা মূল্যে কাঁচামাল দিয়ে তারা সহায়তা করেছে। এখন আমরা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থান তৈরি করছি।’
শুধু সালমা নন, মহেশপুরের অন্তত ৪০টি গ্রামের প্রায় ছয় হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এভাবে বাড়ি বাড়ি গড়ে ওঠা ইমিটেশন গয়নার কারখানায়।
শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি) রোজিনা খাতুন জানান, প্রথমে ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ দেওয়া হয়। বর্তমানে ১ হাজার ৮০০ জনকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যা পুরো জনপদের অর্থনীতির চিত্র বদলে যেতে সহায়তা করছে।
মানুষের পাশে
জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন, আরআরএফ, শিশু নিলয় ছাড়াও বাঁচতে শেখা, আর্স বাংলাদেশ, আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, সমাধান, আল কামীম শিক্ষা ও পরিবেশন ফাউন্ডেশন, জয়তী সোসাইটি, আশা, ব্র্যাক, ব্যুরো বাংলাদেশ ও হেইপারের মতো বিভিন্ন সংস্থা যশোরে উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কৃষিভিত্তিক ও সৌরচালিত সেচপাম্পের মতো কার্যক্রম প্রশংসনীয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থাগুলো।