চিকিৎসা দিচ্ছেন এস সি পণ্ডিত। গত বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইলের কালিহাতীর কুষ্টিয়া গ্রামে
চিকিৎসা দিচ্ছেন এস সি পণ্ডিত। গত বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইলের কালিহাতীর কুষ্টিয়া গ্রামে

গ্রামের মানুষের টানে মাসে তিন দিন বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেন এস সি পণ্ডিত

ছোটবেলায় দেখেছেন, টাকার অভাবে গ্রামের অনেক মানুষ চিকিৎসা করাতে পারেন না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই চিকিৎসক হলে গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন সমর চন্দ্র পণ্ডিত (এস সি পণ্ডিত)। চিকিৎসক হওয়ার পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেমেছেন তিনি।

ছয় বছর ধরে নিজ গ্রাম টাঙ্গাইলের কালিহাতীর কুষ্টিয়ায় মাসে দুই দিন বিনা মূল্যে রোগী দেখেন সমর চন্দ্র পণ্ডিত। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাসে এক দিন রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেন তিনি।

বর্তমানে এস সি পণ্ডিত গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাক, কান ও গলা বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (কনসালট্যান্ট) হিসেবে কর্মরত। তিনি অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নরেন্দ্র চন্দ্র পণ্ডিত ও পুষ্পরানী দেবীর ছেলে। তিনি কালিহাতী সদরের রামগতি শ্রীগোবিন্দ উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৯৯ সালে কালিহাতী কলেজ (বর্তমানে শাজাহান সিরাজ কলেজ) থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ভর্তি হন খুলনা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে ২০০৫ সালে এমবিবিএস পাস করেন। পরে ২০০৭ সালে ভর্তি হন তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নাক, কান, গলা বিভাগের উচ্চতর প্রশিক্ষণে। ২০১০ পর্যন্ত চলে এই প্রশিক্ষণ। পরে ২০১০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের নাক, কান, গলা বিভাগের ডিএলও (এটি নাক, কান ও গলার ওপর একটি বিশেষায়িত স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা ডিগ্রি) কোর্সে ভর্তি হন।

চিকিৎসার জন্য অপেক্ষারত রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। গত বৃহস্পতিবার কালিহাতীর কুষ্টিয়া গ্রামে

এস সি পণ্ডিত বলেন, ‘তিনি ডিএলও কোর্স করার সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের নাক, কান ও গলা বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক এ এফ মহিউদ্দিন খান। স্যার বিভিন্ন স্থানে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ক্যাম্পের আয়োজন করতেন। আমি তাঁর সঙ্গে এসব ক্যাম্পে অংশ নিয়েছি। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার সময় উপকূলীয় অঞ্চলে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ক্যাম্পে কাজ করার সুযোগ হয়। এসব ক্যাম্পে অংশ নিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ে গ্রামের মানুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করি। এতে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যাপারে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হই।’

এস সি পণ্ডিত আরও বলেন, ২০১০ সালে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ২০১১ সালে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। তখন থেকেই অনিয়মিতভাবে নিজ গ্রামে বিনা মূল্যে কিছু রোগী দেখতেন। ২০১২ সালে টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নাক, কান, গলা বিভাগের কনসালট্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন। ২০২৩ সালে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁর পদায়ন হয়। ২০২৬ সালের জুনে কাপাসিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাক, কান ও গলা বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (কনসালট্যান্ট) হিসেবে তিনি বদলি হন। তবে ২০২০ সাল থেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে নিজ গ্রাম কুষ্টিয়াতে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু করেন। প্রতি মাসের প্রথম ও তৃতীয় বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা থেকে রোগী দেখা শুরু করেন। এ জন্য প্রতি মাসের প্রথম ও তৃতীয় বুধবার নিজ গ্রাম ও আশপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকায় মাইকে এই চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের প্রচার চালানো হয়।

এস সি পণ্ডিতের মা পুষ্পরানী দেবী বলেন, ‘আমার ছেলে গ্রামে এসে সাধারণ মানুষদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেয়। মা হিসেবে আমি এর জন্য গর্বিত।’

এস সি পণ্ডিতের গ্রামে একদিন

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন কুষ্টিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে অর্ধশতাধিক চেয়ারে বসে আছেন রোগী ও তাঁর স্বজনেরা। ক্রম অনুযায়ী নাম ডাকা হচ্ছে। একজন করে ভেতরে যাচ্ছেন চিকিৎসা নিতে। চিকিৎসক দেখার পর ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বের হয়ে আসছেন তাঁরা। পরে আরেকজনের নাম ডাকা হচ্ছে। এর মধ্যে বাড়ির ভেতর থেকে ট্রে ভর্তি চায়ের কাপ নিয়ে এলেন একজন কর্মী। অপেক্ষমাণ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের চা পান করানো হলো। শখানেক রোগী ওই দিন চিকিৎসা নিতে এসেছেন বলে জানান এস সি পণ্ডিত।

‘নাকের একটা সমস্যা হয়েছে। তাই দেখাতে এসেছি। এস সি পণ্ডিতের কারণে আমরা বিনা মূল্যে চিকিৎসা করাতে পারি।’
শফিকুল ইসলাম, ওষুধ ব্যবসায়ী , কালিহাতী সদর

রোগী ও এলাকাবাসী যা বললেন

বৃহস্পতিবার ঘাটাইলের সাহাপুর গ্রাম থেকে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী বায়েজিত খান তার ফুফু মমতাজ বেগমকে নিয়ে এসেছিল। মমতাজের কানে সমস্যা। বায়েজিত বলে, ‘ঘাটাইল হাসপাতালের একজন কর্মচারীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি এখানে প্রতি মাসের প্রথম ও তৃতীয় বৃহস্পতিবার বিনা মূল্যে রোগী দেখা হয়। তাই ফুফুকে নিয়ে এসেছি।’

কালিহাতী সদরের ওষুধ ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নাকের একটা সমস্যা হয়েছে। তাই দেখাতে এসেছি। এস সি পণ্ডিতের কারণে আমরা বিনা মূল্যে চিকিৎসা করাতে পারি।’

৯ বছরের শিশুসন্তান তাহসিন একরামকে দেখাতে কালিহাতী সদরের বাজার এলাকা থেকে এসেছিলেন গৃহবধূ কামরুন্নাহার। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের টনসিলের সমস্যা। তাই দেখাতে এসেছিলাম। ডাক্তার দেখে কিছু পরীক্ষা দিয়েছেন। আর ঠান্ডা পানি খাওয়াতে নিষেধ করেছেন।’

এস সি পণ্ডিতের বিষয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয় কালিহাতী রামগতি শ্রীগোবিন্দ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুব্রত ভট্টাচার্যের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কানে একটু সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই এখানে এসেছি। এস সি পণ্ডিত আমাদের স্কুলের সাবেক ছাত্র। সে শহরে থাকে। কিন্তু গ্রামের কথা, গ্রামের মানুষের কথা ভোলেনি। তাই মাসে দুইবার এসে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেয়। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করি।’

শাজাহান সিরাজ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) টাঙ্গাইল জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক জহিরুল হক বলেন, এস সি পণ্ডিত নিজ গ্রামে মাসে দুই দিন এবং টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাসে এক দিন বিনা মূল্যে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেন। তাঁর মতো মানবিক সেবা নিয়ে যদি অন্য চিকিৎসেকরাও এগিয়ে আসতেন, তাহলে দেশের অসংখ্য দরিদ্র অসহায় মানুষ উপকৃত হতেন। চিকিৎসাসেবা হয়ে উঠত আরও জনকল্যাণমুখী।

এস সি পণ্ডিত নিজ গ্রামে মাসে দুই দিন এবং টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাসে এক দিন বিনা মূল্যে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেন। তাঁর মতো মানবিক সেবা নিয়ে যদি অন্য চিকিৎসেকরাও এগিয়ে আসতেন, তাহলে দেশের অসংখ্য দরিদ্র অসহায় মানুষ উপকৃত হতেন।
জহিরুল হক, যুগ্ম সম্পাদক, সুজন, টাঙ্গাইল জেলা শাখা

এই সেবা অব্যাহত রাখতে চান এস সি পণ্ডিত

এস সি পণ্ডিত বলেন, ‘আমি যত দিন কর্মক্ষম আছি তত দিন নিজ গ্রাম এবং অন্য এলাকায় বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যেতে চাই। এখন মাসে দুই দিন নিজ গ্রামে এবং টাঙ্গাইলের সন্তোষে এক দিন চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি। পরিকল্পনা আছে, কিছুদিনের মধ্যে সন্তোষে মাসে আরও এক দিন এ কার্যক্রম বাড়াব। আমি দরিদ্র রোগীদের কিছু ওষুধপত্র বিনা মূল্যে দিয়ে থাকি। ভবিষ্যতে আরও বেশি রোগীকে যাতে কিছু ওষুধপত্র দিতে পারি, তার ব্যবস্থা করব। এ ছাড়া বিনা মূল্যে ডায়াবেটিস পরীক্ষার ব্যবস্থা করব।’