
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্ট। সবে ভোরের সূর্য উঁকি দিয়েছে পুব দিগন্তে। এত ভোরেও সৈকতে যে দুই-একজন পর্যটক এসেছেন, তাঁরা কৌতূহল নিয়ে দেখেন, বালিয়াড়ি দিয়ে সুইমিং স্যুট পরে সার্ফিং বোর্ড বগলে নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন দুই সার্ফার। পানিতে সার্ফবোর্ড ভাসিয়ে জলক্রীড়ায় মেতে ওঠা দুই সার্ফারের কসরত দেখতে অল্প সময়ে ভিড় জমে ওঠে ভোরের সৈকতে।
লাবণী পয়েন্ট সৈকতের পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে সার্ফার ফাতেমা আক্তার ( ১৬) ও মো. মান্নানের (২২) এমন নিবিড় অনুশীলন। সার্ফিং গুরু ও কোচ রাশেদ আলমের তত্ত্বাবধানে নিজেদের প্রস্তুত করছেন তাঁরা। স্বপ্ন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করা। এই দুই সার্ফার প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন এশিয়ার সর্ববৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞ এশিয়ান গেমসে। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ৪ অক্টোবর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠেয় গেমসে অংশ নিয়ে ইতিহাস রচনা করতে চলেছেন এই দুই সার্ফার।
সব প্রতিকূলতা, বাজেট-স্বল্পতা, সামাজিক বাধা এবং অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের পরও ফাতেমা ও মান্নানের চোখেমুখে আশার আলো। কেমন করবেন তাঁরা? জানতে চাইলে সাবেক সার্ফার ও কোচ রাশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার পাহাড় ডিঙিয়েও মান্নান-ফাতেমা বিশ্বমঞ্চে চমক দেখাতে পারবেন, দুজনের সেই প্রতিভা আছে। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে কক্সবাজারের সৈকতে যে ঘাম তাঁরা ঝরাচ্ছেন, তার সুফল যেন জাপানের মাটিতেও দেখা মেলে—এটাই এখন দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের একমাত্র প্রত্যাশা।’
কক্সবাজারের মহেশখালীর সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন ফাতেমা আক্তার। তিন বোনের মধ্যে দুই বোনের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য ফাতেমা কক্সবাজার শহরের ঘোনাপাড়ায় মায়ের সঙ্গে থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি সার্ফিং রপ্ত করছেন। তিনি এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। অভাবের তাড়না আর সামাজিক নানা বেড়াজাল ডিঙিয়ে ফাতেমার এই অবস্থানে পৌঁছানো রূপকথাকেও হার মানায়।
একবার কটূক্তির কারণে সাত দিন সার্ফিং বন্ধ রাখতে হয় বলে ফাতেমা জানান। কোচ রাশেদ আলম তখন তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁকে বোঝান। ফাতেমাও নিয়মিত মাকে বোঝাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের সম্মতি মেলে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখে ফাতেমা প্রমাণ করতে চান, মেয়েরাও সব পারে।
সার্ফিং শুরু করার পর থেকেই নানা কটূক্তি সইতে হয়েছে তাঁকে। ফাতেমা বলেন, ‘আমি যখন প্রতিদিন সার্ফিং করতে আসতাম, তখন মানুষ অনেক কিছু বলত, খারাপ চোখে তাকিয়ে থাকত। এমনকি আমার পরিবারকেও নানা কথা শুনতে হয়েছে। বলত, মেয়ের বিয়ে হবে না।’
একবার এমন কটূক্তির কারণে সাত দিন সার্ফিং বন্ধ রাখতে হয় বলে ফাতেমা জানান। কোচ রাশেদ আলম তখন তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁকে বোঝান। ফাতেমাও নিয়মিত মাকে বোঝাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের সম্মতি মেলে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখে ফাতেমা প্রমাণ করতে চান, মেয়েরাও সব পারে।
সার্ফার মান্নানে বাড়ি শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বাহার ছড়ায়। চতুর্থ শ্রেণি পড়া মান্নান মাকে হারিয়েছেন শৈশবে। বাবা ভাঙারির জিনিসপত্র বিক্রি করেন। সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই মান্নানের কাঁধে চেপেছে এখন। তাই দিনে সার্ফিং অনুশীলনের পর রাতে সৈকতে ঝিনুকের মালা বিক্রি করেন তিনি। মান্নান বলেন, ‘অনেক বাধা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু এসব বাধা এড়িয়ে আমি সার্ফিংকে আঁকড়ে ধরে আছি, সার্ফিং করে যাচ্ছি, যার কারণে আজ এশিয়ান গেমসে নির্বাচিত হতে পেরেছি।’
ফাতেমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল দেশের বাইরে গিয়ে সার্ফিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেব। সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। প্রত্যাশা, জাপানে গিয়ে বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু করব।’
সার্ফার মান্নানে বাড়ি শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বাহার ছড়ায়। চতুর্থ শ্রেণি পড়া মান্নান মাকে হারিয়েছেন শৈশবে। বাবা ভাঙারির জিনিসপত্র বিক্রি করেন। সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই মান্নানের কাঁধে চেপেছে এখন। তাই দিনে সার্ফিং অনুশীলনের পর রাতে সৈকতে ঝিনুকের মালা বিক্রি করেন তিনি। মান্নান বলেন, ‘অনেক বাধা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু এসব বাধা এড়িয়ে আমি সার্ফিংকে আঁকড়ে ধরে আছি, সার্ফিং করে যাচ্ছি। যার কারণে আজ এশিয়ান গেমসে নির্বাচিত হতে পেরেছি।’
কক্সবাজার সৈকত প্রাকৃতিকভাবে সার্ফিংয়ের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও এখানকার ঢেউয়ের ধরন এবং জাপানের আইচি-নাগোয়ার সমুদ্রের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। জাপানে যে ধরনের শক্তিশালী ও টেকনিক্যাল ঢেউয়ের মুখোমুখি হতে হবে, তার জন্য আগে থেকেই আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং ক্যাম্পে অভ্যস্ত হওয়া জরুরি বলে জানান সার্ফাররা। সার্ফার মান্নান বলেন, ‘কক্সবাজারের ঢেউ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিদেশের ওই চ্যালেঞ্জিং ঢেউয়ের সঙ্গে যদি আমরা আগে পরিচিত না হই, তবে প্রতিযোগিতায় গিয়ে তো টেকাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে!’
মান্নান ও ফাতেমার স্বপ্নযাত্রার পেছনে আছেন কোচ রাশেদ আলম। বছরের পর বছর সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে যিনি তৈরি করছেন দেশের সম্ভাবনাময় সার্ফারদের। রাশেদ আলমেরও অভিযোগ-নিয়মিত প্রশিক্ষণ কিংবা আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতির জন্য নেই পর্যাপ্ত সহায়তা।
কোচ রাশেদ আলম আক্ষেপের বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া বা বালিতে গিয়ে অনুশীলন করতে। কারণ, জাপানে গিয়ে যে ধরনের ঢেউয়ের মুখোমুখি হতে হবে, সেগুলোর সঙ্গে আগে থেকে পরিচিত হলে আমাদের সার্ফারদের পারফরম্যান্স আরও ভালো হতে পারত।’
বাজেট-স্বল্পতার কারণে এবারের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলকেও সাজাতে হয়েছে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে। বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ ও সার্ফিং প্রশিক্ষক সাইফুল্লাহ সিফাত জানান, বর্তমান সরকারের বাজেট-স্বল্পতা ও সার্বিক যৌক্তিক কারণে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বর দুই অ্যাথলেটের সঙ্গে মাত্র একজন অফিশিয়াল জাপানে যাবেন। সেই একজন মানুষই একই সঙ্গে কোচ, ম্যানেজার ও কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। আলাদা করে কোচ বা টেকনিক্যাল টিম পাঠানোর সুযোগ না থাকায় কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে দলটিকে।
ফাতেমা বলেন, ‘কোচ ছাড়া এত বড় প্রতিযোগিতায় গিয়ে আমরা কীভাবে নিজেদের সেরাটা দেব? পানিতে নামার পর আমাদের ভুলগুলো ধরে দেওয়ার জন্য কোচের উপস্থিতি অপরিহার্য ছিল।’
২০২৬ সালের জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় পুরুষ ও নারী বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মান্নান ও ফাতেমা এশিয়ান গেমসের জন্য নির্বাচিত হন। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩টি ডিসিপ্লিন অংশগ্রহণ করছে। বর্তমানে সার্ফিং দলের প্রশিক্ষণ চলছে কক্সবাজার সৈকতে। সমুদ্রের ঢেউ ও আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই চলছে অনুশীলন।