চলনবিলে নৌকাভ্রমণ। শুক্রবার বিকেলে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় চলনবিলের কুন্দইল সেতু এলাকায়
চলনবিলে নৌকাভ্রমণ। শুক্রবার বিকেলে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় চলনবিলের কুন্দইল সেতু এলাকায়

বর্ষায় নতুন রূপে চলনবিল, নৌকাভ্রমণে কাটছে অবকাশ

বর্ষা এলেই অন্য এক রূপে ধরা দেয় চলনবিল। থই থই জলরাশি, হালকা বাতাসে দুলতে থাকা ঢেউ, সারি সারি নৌকা আর মানুষের কোলাহলে জমে ওঠে বিলপাড়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কুন্দইল সেতু ঘিরে এখন সেই চেনা বর্ষার আমেজ। সিরাজগঞ্জ, নাটোর, বগুড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ নৌকাভ্রমণে, কেউ পরিবারের সঙ্গে অবকাশ কাটাতে, আবার কেউ শুধু বর্ষার চলনবিলের রূপ একনজর দেখতে ছুটে আসছেন।

শুক্রবার বিকেলে তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে কুন্দইল সেতুর পথে এগোতেই চোখে পড়ে বর্ষার চলনবিলের রূপ। দীঘি সদগুণা এলাকা পেরিয়ে কামারশোন গ্রামে নৌকার ঘাট। সেখানে ভাড়ায় মেলে ইঞ্জিনচালিত নৌকার পাশাপাশি ছোট ছোট ডিঙিনৌকাও। নিয়মিত যাতায়াতের নৌকাও আছে। এখান থেকে কুন্দইল সেতু পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা; আর পুরো নৌকা ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া করলে গুনতে হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা।

নৌকায় ওঠার আগেই বোঝা যায়, বর্ষার আমেজে মুখর হয়ে উঠেছে বিল। কেউ পানিতে নেমে গোসল করছেন, কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে পানির ধারে এসে থামছেন। আবার অনেকেই মাকড়শোন এলাকা পর্যন্ত যানবাহনে গিয়ে সেখান থেকে নৌকায় চড়ে বিলের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

নৌকা ভাড়া নিয়ে চলনবিল ভ্রমণ করছে একটি পরিবার। গত শুক্রবার সিরাজগঞ্জের তাড়াশের চলনবিলের কুন্দইল সেতু এলাকায়

তাড়াশ সদর এলাকার চাকরিজীবী হারুনার রশিদ বলেন, বর্ষায় বিলে পানি এলেই তিনি মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন।

কুন্দইল সেতুর ঘাটে পৌঁছাতেই মনে হয়, বর্ষার উৎসব যেন বসেছে চলনবিলে। ঘাটজুড়ে সারি সারি নৌকা, মাঝিদের ব্যস্ততা আর দর্শনার্থীর ভিড়। সেতুর রেলিং থেকে অনেকে পানিতে লাফিয়ে পড়ছেন। কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। আবার অনেকে শুধু দাঁড়িয়ে বিলের জলরাশি আর দূরের সবুজের মিতালি উপভোগ করছেন।

বর্ষা এলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় বলে জানান স্থানীয় মাঝি আবদুস সালাম। তিনি বলেন, দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একের পর এক যাত্রী পারাপার ও নৌকাভ্রমণ করাতে হয়। এই মৌসুমের বাড়তি আয়েই সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে।

ঘাটে যাত্রীদের অপেক্ষায় কয়েকটি নৌকা। শুক্রবার বিকেলে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় চলনবিলের কুন্দইল সেতু এলাকায়

বাসে সিংড়া পর্যন্ত এসে সেখান থেকে দুটি নৌকা ভাড়া করে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে চলনবিলে ঘুরতে এসেছেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার ব্যবসায়ী ছোটন চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘নৌকাভ্রমণ আর চারপাশের প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ ছোটনের মেয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী টুসু চক্রবর্তীর উচ্ছ্বাসও কম নয়। সে জানায়, প্রথমবার চলনবিল দেখতে এসেছে। নৌকায় ভেসে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে সে খুব খুশি।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আষাঢ় ও শ্রাবণ চলনবিল ভ্রমণের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। তবে পানির ওপর নির্ভর করে ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্তও দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকে। এবার বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকায় এবং তাড়াশ সদর থেকে কুন্দইল পর্যন্ত সড়কের অবস্থার উন্নতি হওয়ায় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। সেই সঙ্গে জমে উঠেছে মৌসুমি ব্যবসাও। বিলপাড়জুড়ে ভাজাপোড়া, চা ও ফলের কিছু অস্থায়ী দোকান বসেছে। বিক্রি ভালো হওয়ায় খুশি বিক্রেতারা।

অনেকে তিন চাকার যান ও মোটরসাইকেলে করে এখানে ঘুরতে আসেন। গত শুক্রবার তাড়াশের চলনবিলের কুন্দইল সেতু এলাকায়

দর্শনার্থীর বাড়তি ভিড় চলনবিল ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাও সামনে আনছে। লেখক, গবেষক ও খুলনার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক খ ম রেজাউল করিম মনে করেন, চলনবিলের এই অংশকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

চলনবিলে ভ্রমণে আসা মানুষের সুবিধার্থে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন বলে জানান তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান।

বর্ষার জল নামলেই চলনবিল যেন বদলে যায় এক বিশাল জলরাজ্যে। সেই জলরাশির বুকে নৌকার দোল, মানুষের কোলাহল আর প্রকৃতির সান্নিধ্য প্রতিবছরই নতুন করে টেনে আনে দর্শনার্থীদের।