
প্রায় ১০ মাস বন্ধ থাকার পর কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ৮০০ পর্যটক নিয়ে এমভি বার আউলিয়া নামের একটি জাহাজ কক্সবাজারের নুনিয়াছটা বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। জাহাজটিতে ২১ জন কর্মচারীসহ ৩৭ জন আছেন।
আজ সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনা হয়ে জাহাজটি বঙ্গোপসাগরে যাত্রা শুরু করে। প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা একটার মধ্যে জাহাজটির সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পৌঁছানোর কথা। বেলা আড়াইটার দিকে পর্যটকদের নিয়ে জাহাজটি আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা আছে। এ ছাড়া সেখানে রাতযাপন করতে ইচ্ছুক পর্যটকেরা হোটেল-রিসোর্টে থাকবেন।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম জানান, সেন্ট মার্টিনগামী পর্যটকদের জন্য একমুখী জাহাজ ভাড়া সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ভাড়ার টিকিটে কেবিনের সুবিধা আছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরুর কথা ছিল। তবে নানা জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। গতকাল রাতে এমভি বার আউলিয়া জাহাজটি সেন্ট মার্টিনে যাতায়াতের অনুমোদন পায়।
আজ সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ছয়টা থেকে পর্যটকেরা শহরের বিভিন্ন হোটেল থেকে ইজিবাইক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে নুনিয়াছটা বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাটে আসতে শুরু করেন। সেখানে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ, পর্যটন, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সকাল সাতটার দিকে নিবন্ধিত পর্যটকদের বাঁকখালী নদীতে অপেক্ষমাণ এমভি বার আউলিয়া জাহাজে তোলা হয়। জাহাজটির ধারণক্ষমতা ৮৫০ জন।
দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে আছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটকেরা দ্বীপে কী করছেন, কোথাও ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন কি না এবং নিয়ম লঙ্ঘন করে কেউ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ছেঁড়াদ্বীপে যাচ্ছেন কি না, সেসব তদারকের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এর আগে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণ ও রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন।
এমভি বার আউলিয়ার ছাড়াও তিনটি জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেন্ট মার্টিনগামী জাহাজমালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বলেন, অনুমোদনপ্রক্রিয়া শেষ হলে আগামীকাল শুক্রবার এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ এই রুটে চলাচল শুরু করতে পারে।
জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ও অন্য প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় আরও কয়েকটি জাহাজের চলাচল বন্ধ আছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া শেষ হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে আরও তিনটি পর্যটকবাহী জাহাজ এই রুটে চলাচল করতে পারে।
আজ পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের রাতযাপনের জন্য ২৩০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ প্রস্তুত করা হয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা একটার মধ্যে জাহাজটি সেন্ট মার্টিন জেটিঘাটে পৌঁছানোর কথা। সেখানে পর্যটকদের ফুল দিয়ে বরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, একমাত্র সরকার অনুমোদিত জাহাজেই অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে পর্যটকেরা যেতে পারবেন। গত বছর পর্যটকবাহী একটি জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। এবার যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে, এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাহাজগুলোর ফিটনেস যাচাই করছে।
পরিবেশ সংকটাপন্ন সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সেখানে কঠোর বিধিনিষেধ আছে। অতিরিক্ত পর্যটকের সমাগম ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দ্বীপের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ায় দুই বছর আগে সরকার ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেছিল। এখনো এসব নির্দেশনা কার্যকর রয়েছে। পর্যটকদের সেগুলো মেনে চলতে হবে।