
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার ছিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। নওগাঁর ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুটি আসন থেকে চারজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। তবে তিনটি আসনে বিএনপির তিন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হওয়ার পর নওগাঁর এই তিন আসন এখন জেলাজুড়ে আলোচনায়।
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে থাকা ওই তিন প্রার্থীর স্থানীয় অবস্থান শক্ত হওয়ায় বিএনপির ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। এতে দলটির প্রার্থীদের জয়ের পথ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপির ওই তিন বিদ্রোহী প্রার্থী হলেন নওগাঁ-১ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য ছালেক চৌধুরী, নওগাঁ-৩ আসনে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী এবং নওগাঁ-৬ আসনে সাবেক উপমন্ত্রী আলমগীর কবির। আজ বুধবার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার কথা আছে।
মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ওই তিন প্রার্থী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়। তবে তাঁরা নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে অনড় আছেন। প্রতীক বরাদ্দের পর পুরোদমে প্রচারণা শুরু করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ২০১৮ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছিলেন। অন্যদিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ছালেক চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত সভাপতি।
নওগাঁ-১ আসন থেকে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ছালেক চৌধুরী। এ আসনে অন্য বৈধ প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুল আলম, জাতীয় পার্টির আকবর আলী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল হক শাহ।
স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় ৫ জানুয়ারি ছালেক চৌধুরীকে প্রাথমিক সদস্যসহ দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর পক্ষে প্রচার চালানোর অভিযোগে তিন উপজেলায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মীকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
ছালেক চৌধুরী বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি লড়াই করে যেতে চাই। নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনসহ আচরণবিধি মেনে প্রচার চালাচ্ছি। ভোটের ফলাফলের মাধ্যমেই আমার অবস্থানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে চাই।’
অন্যদিকে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দলের মধ্যে বর্তমানে কোনো বিভক্তি নেই। ছালেক চৌধুরী অনেক আগে থেকেই দল থেকে বিচ্ছিন্ন। তিনি প্রার্থী থাকায় ধানের শীষের ভোটে কোনো প্রভাব পড়বে না।’
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফজলে হুদা বাবুল। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী। তিনি মহাদেবপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য এবং প্রয়াত সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে।
পারিবারিকভাবে এলাকায় পারভেজ আরেফিনের একটি শক্ত ভোটব্যাংক রয়েছে। ফলে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় বিএনপির প্রার্থীর জয়ের সমীকরণ জটিল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা।
এই আসনে অন্য বৈধ প্রার্থীরা হলেন জামায়াতে ইসলামীর মাহফুজুর রহমান, জাতীয় পার্টির মাসুদ রানা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নাছির বিন আসগর, বাসদের কালিপদ সরকার এবং বিএনএফের আব্দুল্লাহ আল মামুন।
দলের পক্ষ থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য যোগাযোগ করা হলেও পারভেজ আরেফিন এখনো নির্বাচনে প্রতিদন্দ্বিতার সিদ্ধান্তে অনড় আছেন। এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত মহাদেবপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ইফতেখারুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পারভেজ ভাই নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে অনড় এবং তিনি এলাকায় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।’
এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির। তিনি পঞ্চম থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন।
এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আত্রাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ রেজাউল ইসলাম। অন্য বৈধ প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর খবিরুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রফিকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির আতিকুর রহমান রতন।
আলমগীর কবির বলেন, ‘আমার লড়াই চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে। এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে চাই। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রশ্নই আসে না।’
বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান। তিনি বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।