
ভোরের আলো কেবল স্পষ্ট হচ্ছে। একে একে হাজির হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। চারপাশে বস্তাভর্তি শুঁটকি; বাতাসে মাছের গন্ধ। কেউ সাজাচ্ছেন দোকানের পসরা, কেউ ব্যস্ত বিভিন্ন জাতের শুঁটকি গুছিয়ে তুলতে। কাজের চাপে দম নেওয়ারও ফুরসত নেই। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাটে বাড়তে থাকে কোলাহল-ক্রেতাদের আনাগোনা। দরদাম, হাঁকডাক আর ব্যস্ততায় ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে জেগে উঠেছে শুঁটকির মেলা।
এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার শত বছরের পুরোনো বিনিময়প্রথার শুঁটকিমেলার চিত্র। আজ বুধবার সকালে গিয়ে এসব দৃশ্য দেখা যায়। উপজেলার কুলিকুন্ডা গ্রামের কুলিকুন্ডা (উত্তর) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে দুই দিনব্যাপী এই মেলা শেষ হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার।
নাসিরনগর উপজেলায় বিনিময়প্রথার শুঁটকিমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলার প্রধান পণ্য শুঁটকি। পাওয়া যাচ্ছে নানা জাতের মাছের শুঁটকি। কেনাবেচা হচ্ছে অন্য পণ্যও। এবার মেলায় দুই কোটি থেকে তিন কোটি টাকার শুঁটিক বেচাকেনা হবে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
বাংলা পঞ্জিকার নিয়মানুযায়ী, বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে নিয়মিতভাবে প্রতিবছর এই মেলা বসে। স্থানীয় জেলেরা পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই ব্যতিক্রমধর্মী এ মেলার আয়োজন করেন।
গ্রামবাসী ও মেলায় আসা একাধিক ব্যক্তি জানান, কবে মেলার প্রথম আয়োজন, তা জানা না গেলেও প্রতিবছরই এ মেলা বসে। এই ‘শুঁটকিমেলা’ অনেক পুরোনো। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শুঁটকি ব্যবসায়ী ছাড়াও ভোজনরসিকেরা আসেন এ মেলায়। এ মেলার কোনো আয়োজক কমিটি নেই; ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ মেলা জমে ওঠে।
প্রাচীনকালে যখন কাগজের মুদ্রা প্রচলিত হয়নি, ঠিক তখন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকজন নিজেদের উৎপাদিত শুঁটকি বিক্রি করতেন। স্থানীয় কৃষকেরা চাল, ডাল, ধান, শিমের বিচি, আলু, শর্ষে, পেঁয়াজ, রসুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকি কিনতেন। এই মেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকি কেনাবেচা। মেলায় প্রাচীন আমলের পণ্য বিনিময়ের প্রথা ঐতিহ্য রক্ষায় স্বল্প সময়ের জন্য হলেও পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকির বিনিময় হতো। কিন্তু এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন নগদে বিক্রি হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শুঁটকি ব্যবসায়ীরাও শুঁটকি বিক্রি করতে ও কিনতে মেলায় এসেছেন।
উপজেলার কুলিকুন্ডা গ্রামে পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকির আদান–প্রদানের প্রথা কমে এসেছে। তবে উপজেলার মহকালপাড়ায় পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকির আদান–প্রদান হয়। ডাল, শজনে ডাঁটা, ডাঁটা, পুঁইশাক, লালশাক, করলা, কুমড়া, লতাপাতা ইত্যাদিসহ বিভিন্ন সবজির সঙ্গে শুঁটকি বিনিময় করেছেন নারী শুঁটকি ব্যবসায়ীরা।
শুধু স্থানীয় লোকজন নন, সিলেট, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ প্রভৃতি জেলার ব্যবসায়ীরা মেলায় আসেন। মেলায় বোয়াল, গজার, শোল, বাইম, ছুরি, লইট্টা, পুঁটি, গনা, গুচি, ট্যাংরা, আইড়সহ আড়াই শর বেশি ধরনের শুঁটকির পসরা নিয়ে বসেছেন দোকানিরা। এ ছাড়া মেলায় ইলিশ ও সামুদ্রিক নানা বিরল জাতের মাছের শুঁটকি রয়েছে। শুঁটকি ছাড়াও ইলিশ ও কার্পজাতীয় বিভিন্ন মাছের ডিমও রয়েছে দোকানিদের পসরায়। মেলায় স্থানীয় কুমারদের হাতের তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, ঝাঁজর, থালা, ঘটি, বদনা, বাটি, পুতুলসহ নানা ধরনের সামগ্রী আছে।
আজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে নাসিরনগর উপজেলার কুলিকুন্ডা উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে গিয়ে শুঁটকি ব্যবসায়ীদের দেখা যায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের শুঁটকির পসরা সাজাতে ব্যস্ত দেখা যায়।
স্থানীয় লোকজন জানান, সূর্য ওঠার আগেই বিনিময়প্রথার মেলা হতো। তবে এই বিনিময় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলায় ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়ে। বিকেলে ক্রেতাদের ভিড় বেশি হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
কুলিকুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা হাজী দাউস খন্দকার (৬০) বলেন, ‘আমার বাপ-দাদা শুঁটকিমেলায় নিয়মিত যেতেন। এটি ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরোনো মেলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাশাপাশি সিলেট, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার লোকজন এখানে শুঁটকি কিনতে আসেন।’
সরাইল মালিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মুজিবুর রহমান বলেন, ‘২০-২২ বছর ধরে মেলায় শুঁটকি বিক্রি করে আসছি। গত বছর সাড়ে ১৩ লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করেছি। এ বছর ১৫ লাখ টাকার ১৭ জাতের শুঁটকি এনেছি। আশা করছি, ২০ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারব।’
মেলায় শোল শুঁটকি প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা, বোয়াল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, দেশি বাইম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, পাপাইয়া ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, তিন জাতের বাইম ১ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা, বামর ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গুনিয়াউক বাজারে খুচরা শুঁটকি বিক্রি করেন উপজেলার গুনিয়াউক ইউনিয়নের বাসিন্দা কৃষ্ণধন। তিনি বলেন, ‘২০-৩০ হাজার টাকার শুঁটকি কিনব। ৩০ বছর ধরে এখান থেকে শুঁটকি কিনে আসছি।’
হবিগঞ্জের মাধবপুরের কলমদর মিয়া বলেন, ‘১৫ বছর ধরে মেলায় আসছি। ২০২৪ সালে সাড়ে ৩ লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করেছিলাম। এবার সাড়ে ছয় লাখ টাকার শুঁটকি এনেছি।’