মঞ্জুয়ারা খাতুন
মঞ্জুয়ারা খাতুন

মিঠাপানির খোঁজে নয়ানীর নারীদের প্রতিদিনের সংগ্রাম

প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের কম অংশগ্রহণ, সীমিত অর্থায়ন, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের কারণে পানিসংক্রান্ত সমস্যায় নারী ও মেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব পানি দিবসের প্রচারণা একটি পরিবর্তনমুখী, অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান জানায়, যেখানে পানিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা নিজেদের বক্তব্য দিতে পারবেন এবং নেতৃত্ব ও সমান সুযোগ পাবেন। এভাবে পানি হয়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা আমাদের সবার জন্য আরও সুস্থ, সমৃদ্ধ ও লিঙ্গসমতাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। আর এ বছর বিশ্ব পানি দিবসের স্লোগান নির্ধারিত হয়েছে, ‘পানির প্রবাহ যেখানে, সাম্যের হাসি সেখানে’। বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি-২০২৩-২০৫০) হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি একটি কৌশলগত পরিকল্পনা। আটটি প্রধান খাতে (পানিসম্পদ, কৃষি, দুর্যোগ, শহর ইত্যাদি) অভিযোজন কার্যক্রমের মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে এ পরিকল্পনায়। এখানে মোট ১১টি অঞ্চলকে বাংলাদেশের জলবায়ু–সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত বছর সরকার রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলা এবং চট্টগ্রামের পটিয়ার বেশ কিছু এলাকাকে ‘অতি উচ্চ’ ও ‘উচ্চ’ পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে। পানি দিবসের আয়োজনে এখানে একটি এলাকার নারীদের পানির জন্য সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হলো।

খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের পূর্ব দিকে, সুন্দরবনঘেঁষা ছোট্ট গ্রাম নয়ানী। চারদিকে সবুজ বন আর জলাভূমি থাকলেও গ্রামের মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভাব মিঠাপানির। ইউনিয়নের অন্য গ্রামের মতো এখানেও লবণাক্ততার দাপট তীব্র। মাটির নিচের পানিও নোনা, তাই গ্রামের মানুষের ভরসা পুকুরের পানি।

গ্রামের মাঝখানে বিস্তৃত বিলের মধ্যে রয়েছে একটি পুরোনো পুকুর। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘বিলের পুকুর’ নামে। এই পুকুর থেকেই আশপাশের চারটি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন খাওয়ার পানি সংগ্রহ করেন। বেশির ভাগ পরিবারের জন্য এই দায়িত্বটি পড়ে নারীদের ওপরই।

শনিবার (১৪ মার্চ) ভোরের আলো ফুটতেই কলসি হাতে বাড়ি থেকে বের হন নয়ানী গ্রামের বাসিন্দা মঞ্জুয়ারা খাতুন। প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের এই পুকুরই তাঁর পরিবারের একমাত্র পানির উৎস। প্রথম দফায় এক কলসি পানি আনার পর সকাল ৯টার দিকে দ্বিতীয়বারের মতো রওনা দেন তিনি।

বাড়ি থেকে বেড়িবাঁধের রাস্তা, মৎস্যঘেরের আল আর বিস্তৃত বিল পেরিয়ে পুকুরে পৌঁছাতে তাঁর সময় লাগে প্রায় আধা ঘণ্টা। পুকুরের চারপাশে পদ্মপাতা ভাসছে, শুষ্ক মৌসুমে পানিও অনেক নিচে নেমে গেছে।

পুকুরের সিঁড়িতে কলসি রেখে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে মঞ্জুয়ারা বলেন, ‘বিকেলে আবার পানি নিতি আসতি হবে। প্রতিদিন তিন কলসি পানি লাগে রান্না আর খাওয়ার জন্য। এলাকায় অনেকেই ভালো কল বসানোর চেষ্টা করিছে, কিন্তু কলের পানি জন্মের নোনা—মুখে দেওয়া যায় না। তাই এই পুকুরের পানিই খাতি হয়।’

স্থানীয়দের মতে, এই উপকূলীয় জনপদে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে গভীর পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) প্রযুক্তির ব্যবহার কার্যকর হতে পারে।