হাটে চলছে পান বেচাকেনা। গতকাল রাজশাহীর মোহনপুরের মৌগাছি পান হাটে
হাটে চলছে পান বেচাকেনা। গতকাল রাজশাহীর মোহনপুরের মৌগাছি পান হাটে

রাজশাহীতে উৎপাদন খরচ ‘উঠছে না’, হতাশ পানচাষিরা

পানচাষিদের ভাষ্য, সার, কীটনাশকসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু হাটে সেই তুলনায় পানের দাম বাড়েনি।

‘বরজে পান তো আর ফেলে রাখা যায় না। প্রতি বিড়া অন্তত ১৫ টাকা আশা করেছিলাম। কিন্তু দাম বলা হচ্ছে মাত্র ১০ টাকা। এক বিঘা জমিতে পান চাষ করে এখন চরম লোকসানে আছি। পান বিক্রি করে সংসার চালানো যাচ্ছে না।’—আক্ষেপের সঙ্গে বলছিলেন রাজশাহীর মোহনপুরের পানচাষি মো. এরশাদ।

গতকাল রোববার সকালে রাজশাহীর অন্যতম পান বিক্রয়কেন্দ্র মোহনপুরের মৌগাছি পান হাটে কথা হয় এই চাষির সঙ্গে। সেখানে কথা হয় আরও বেশ কয়েকজন পানচাষির সঙ্গে।

পানচাষিদের ভাষ্য, পানের উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কম। সার, কীটনাশক, খইল, সেচ, বাঁশ-খুঁটি, শ্রমিকের মজুরিসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু হাটে সেই তুলনায় পানের দাম বাড়েনি। এতে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন অনেক চাষি।

চাষিরা জানান, বর্তমানে ছোট আকারের পান মানভেদে প্রতি বিড়া ১০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের পান ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও তা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম।

রাজশাহীতে ১ বিড়ায় ৬৪টি পান থাকে, ৩২ বিড়ায় হয় ১ পোয়া। বাজারে সাধারণত বিড়া ও পোয়া—দুই হিসাবেই পান বিক্রি হয়।

লাভ তো দূরের কথা, শুধু হাতে নগদ টাকা পাওয়ার জন্য পান বিক্রি করতে হচ্ছে।
মো. জিয়াউল ইসলাম, পানচাষি

পানচাষি মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ১ বিড়া পান ৩৫ টাকায় বিক্রি হলে কোনো রকমে খরচ ওঠে। এখন এর তিন ভাগের এক ভাগ দাম পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘লাভ তো দূরের কথা, শুধু হাতে নগদ টাকা পাওয়ার জন্য পান বিক্রি করতে হচ্ছে।’

হাটে দেখা যায় মো. সোহেল রানার সঙ্গে পান ব্যবসায়ীদের দর-কষাকষি চলছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ওই দামে পান বিক্রি করলেন না। সোহেল বলেন, এক বিঘা জমিতে বরজ তৈরি ও চারা রোপণ করতেই প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। এরপর সারা বছর পরিচর্যা, সার ও কীটনাশকে আরও প্রায় এক লাখ টাকা লাগে। অর্থাৎ, বছরে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হলেও এক লাখ টাকার পান বিক্রি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

কয়েকজন চাষির ভাষ্য, বরজ তৈরির বাঁশসহ অন্যান্য উপকরণের দাম অনেক বেড়েছে। প্রতি বিড়া পান ৫০ টাকার বদলে অন্তত ৮০ টাকা হলে চাষিদের জন্য ভালো হতো।

মৌগাছি হাট শুরু হয় ফজরের নামাজের পর, চলে সকাল নয়টা পর্যন্ত। ভোরে গিয়ে দেখা যায়, হাটে পান নিয়ে এসেছেন চাষিরা। হাটের ভেতরে জায়গা না হওয়ায় অনেক চাষি রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের দুই পাশে বসেছেন। হাঁকডাকে চলছে পান বিক্রি। এক পাশে পানের পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে সুপারি।

হাটে কথা হয় মোহনপুরের ত্রিমোহনী এলাকার চাষি মো. ইয়ামিন আলীর সঙ্গে। তিনি ১০ কাঠা জমিতে পান চাষ করেন। ইয়ামিন আলী বলেন, বরজ পরিচর্যায় বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। খইল, সার, কীটনাশক ও সেচে বড় অঙ্কের টাকা চলে যায়। অথচ হাটে প্রতি বিড়া ২০ টাকা দাম বলা হচ্ছে। ‘প্রতি বিড়া ৫০ টাকা না পেলে টিকে থাকা কঠিন,’—বলেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পানের দাম মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। পঞ্চগড়ে পান পাঠানো আড়তদার মো. মাইনুল ইসলাম বলেন, হাটে পান বেশি এলে দাম কমে যায়। আবার সরবরাহ কম থাকলে দাম বেড়ে যায়।

ব্যবসায়ী মো. তজিবর বলেন, পানের মান ও মৌসুমের ওপর দাম ওঠানামা করে। তাঁরা ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পান সরবরাহ করেন। মোহনপুরের ব্যবসায়ী তৈবুর রহমান বলেন, সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনের কারণে দামে পার্থক্য হয়।

চাষিরা বলছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে পানের দাম বাড়তে পারে। তাঁদের ভাষ্য, এখন ১টি পানগাছে ১৫ থেকে ১৬টি পাতা রয়েছে। কিছুদিন পর তা কমে ছয় থেকে সাতটিতে নেমে আসবে। এ ছাড়া অনেকের বরজ পচে বা মরে যেতে পারে।

দুর্গাপুরের চাষি মিজানুর বলেন, কার্তিক থেকে চৈত্র পর্যন্ত শীতের মৌসুমে পানের উৎপাদন কমে গেলে প্রতি বিড়ার দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। কিন্তু বছরের অন্য সময়ে কম দামে পান বিক্রি করে যে লোকসান হয়, তা পোষানো কঠিন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছর রাজশাহী জেলায় ৫ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে পান চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮৬ হাজার ৮২৪ মেট্রিক টন। গত বছর জেলার ৯টি উপজেলায় ৪ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমিতে পান চাষ করা হয়েছিল। উৎপাদিত হয়েছিল ৭৯ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, বর্ষায় পানের উৎপাদন বেশি হওয়ায় এ সময়ে দাম কিছুটা কম থাকে। তবে অন্য মৌসুমে কৃষকেরা ভালো দাম পান।