রাজশাহীতে সারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন কৃষকেরা, কিন্তু ডিলার বিক্রয়কেন্দ্রই খোলেননি। রোববার দুপুরে পবার আলীমগঞ্জ এলাকায়
রাজশাহীতে সারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন কৃষকেরা, কিন্তু ডিলার বিক্রয়কেন্দ্রই খোলেননি। রোববার দুপুরে পবার আলীমগঞ্জ এলাকায়

রাজশাহীতে সারের জন্য কৃষকদের হয়রানি চলছেই, ডিডিকে সাতক্ষীরায় বদলি

রাজশাহীতে আমনের ভরা মৌসুমে সারের জন্য একের পর এক হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকেরা। সারের জন্য ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কৃষকেরা অপেক্ষা করছেন, কিন্তু বিক্রয়কেন্দ্র খোলার লোক নেই। এ অবস্থায় কৃষকেরা এক ডিলারের কাছ থেকে আরেক ডিলারের কাছে ছুটছেন।

এদিকে সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে খবর প্রকাশের পর গতকাল শনিবার রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রে বদলি করা হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন শরীয়তপুরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন। অন্যদিকে অবৈধ সার মজুতের ঘটনায় গতকাল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছে তদন্ত কমিটি।

আজ রোববার সকালে জেলার পবা উপজেলার আলীমগঞ্জ এলাকার বিসিআইসির সার ডিলার আবদুল গাফফারের সার বিক্রয়কেন্দ্র ‘মেসার্স মুনলাইট কৃষি বিতানে’ গিয়ে বন্ধ পান একদল কৃষক। ডিলারকে ফোন দিলে তিনি বলেন, তিনি রাজশাহীর বাইরে আছেন। তাঁর ব্যবস্থাপককে ফোন দিতে বলেন। তাঁকে ফোন দিলে বলেন, তিনি বাজার করতে এসেছেন।

সার নিতে আসা পবার নতুন কসবা গ্রামের কৃষক গোলাম পাঞ্জাতন বলেন, এবার ১১ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত এক ছটাক সারও দিতে পারেননি। এই ডিলারের দোকানে তিন দিন ঘুরে গেছেন, কিন্তু দোকান খোলা পাননি। আজও সার না পেয়ে খালি হাতে ফিরেছেন।

একই বিক্রয়কেন্দ্রে সার নিতে এসেছিলেন গোদাগাড়ীর চাপাল গ্রামের কৃষক আতাউল হোসেন। তিনি চার বিঘা জমিতে কোনো সার দিতে পারেননি। তিনি বলেন, গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ি এলাকার ডিলারের কাছ থেকে সার নেন, কিন্তু এবার তিনি সার দিতে পারছেন না। এখানে এসেও পেলেন না। এখন ডিলার নজরুল ইসলামের কাছে যাবেন।

বেলা একটার দিকে ডিলার আবদুল গাফফারকে ফোন করলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখন তাঁর ব্যবস্থাপক দোকান খুলেছেন। ততক্ষণে যাঁরা সার নিতে এসেছিলেন, সবাই অন্য ডিলারের কাছে ছুটে যান। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, তাঁরা পাঁচজন কৃষক ডিলার নজরুল ইসলামের কাছ থেকে সাত বস্তা ইউরিয়া সার নিতে পেরেছেন।

গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোতে ‘চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষক, দামও বেশি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর আগের দিন বুধবার এ নিয়ে প্রথম আলোতে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এর পর থেকে কর্তৃপক্ষ অভিযান জোরদার করেছে। একই দিনে চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে। এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই প্রায় ১০ লাখ টাকার সার জব্দ করা হয়।

এ ঘটনায় শুক্রবার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক মো. খালেদুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার ও তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ। গতকাল কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে অতিরিক্ত পরিচালক মো. আজিজুর রহমানকে ফোন করলে মিটিংয়ে আছেন বলে জানান। পরে আজ দুপুর পর্যন্ত একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কেটে দেন। আজ দুপুরে কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর কর্মচারীরা জানান, বেলা আড়াইটার দিকে তিনি দুপুরের খাবার খেতে বাসায় যান। বিকেল পৌনে চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও তিনি কার্যালয়ে ফেরেননি।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন পাননি। এত সার ওই ব্যবসায়ী কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন—জানতে চাইলে বলেন, বিভিন্ন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ওই ব্যবসায়ী সারগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। ওই সব ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। আর তদন্ত প্রতিবেদন পেলে সেই অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, রাজশাহীর জন্য বাড়তি সার চাওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সংকট তৈরি না হয়।