মুন্সিগঞ্জে আলুর বাজার

লাগামছাড়া দাম, তদারকি নেই

আলুর দাম আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। সরকার আলুর দাম নিয়ন্ত্রণেও ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা।

মুন্সিগঞ্জের হিমাগার ও খুচরা বাজারে আলুর দামের আগের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। হিমাগার পর্যায়ে প্রতি কেজি ৪৫-৪৭ টাকা ও খুচরা বাজারে ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গতকাল সোমবার হিমাগার ও কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অথচ সরকারি নির্দেশনা ছিল, হিমাগার পর্যায়ে ২৬-২৭ ও খুচরা বাজারে ৩৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হবে।

মুন্সিগঞ্জ বড়বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ৫৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রামের বাজারগুলোতে ৬০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করা হচ্ছে। জানতে চাইলে সবজি ব্যবসায়ীরা বলেন, আড়ত ও হিমাগারে প্রশাসনের কোনোরকম তদারকি নেই। সরকারি দামে কেউ আলু বিক্রি করছেন না। হিমাগার থেকে প্রতি কেজি ৪৫-৪৬ টাকায় আলু কিনে আড়তে পাঠান ব্যবসায়ীরা।

আড়ত থেকে পাইকারি ৫০ টাকা কেজি দরে আলু কিনতে হচ্ছে। বাজার পর্যন্ত আলু পৌঁছাতে আরও ২ টাকা খরচ হয়ে ৫২ টাকা দাম পড়ছে। সে জন্য খুচরায় দাম পড়ছে মানভেদে ৫৫-৫৬ টাকা। গ্রামের বাজারগুলোতে পৌঁছাতে খরচ আরও বেশি হওয়ায় ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, হিমাগারে আলুর দাম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সবখানেই আলুর দাম কমে আসত।

বড়বাজারে আলু কিনতে আসা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন আলুর দাম বাড়ছে। ১০ দিন আগে ৪৫ টাকা কেজি দরে কিনলাম। সে আলু পাঁচ দিন আগে ৫০ টাকা, আজ ৫৫ টাকা কেজি দরে কিনতে হচ্ছে। সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, খুচরায় ৩৫–৩৬ টাকা দরে আলু কিনতে পারব। মুন্সিগঞ্জের প্রশাসনও জোরগলায় বলেছিল, এ দাম বহাল থাকবে। সিন্ডিকেটের কাছে সবাই পরাজিত।’

সদর উপজেলার মুক্তারপুর এলাকার পঞ্চসার মাল্টিপারপাস কোল্ডস্টোরেজে গিয়ে দেখা যায়, হিমাগার থেকে আলু বের করে বাছাই করছেন শ্রমিকেরা। অনেকেই বাছাই করা আলু বস্তায় ভরে মাপছেন। এসব আলুর মূল্য নির্ধারণ ছাড়াই চট্টগ্রাম ও বরিশালের ভোলার আড়তে পাঠাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ ফোনের মাধ্যমে দাম ঠিক করে সেগুলো পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। হিমাগারে শেডের নিচের চৌকিতে বসে ব্যবসায়ীরা আলু দরদাম করছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, আলুর দাম আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এর আগে কখনো এমন দাম হয়নি। সরকার আলুর দাম নিয়ন্ত্রণেও ব্যর্থ হলো। সব টাকা কামিয়ে নিলেন মজুত ব্যবসায়ীরা।

বাবুল পাইক নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘কয়েক দিন আগে মজুত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৪৫ টাকা ৮৩ পয়সা কেজি দরে ৫৩০ বস্তা আলু কিনেছিলাম। সে আলু বাছাই করতে ও আড়তে পাঠাতে আরও দুই টাকা খরচ হয়। এর পরে আমরা ৫০ পয়সা লাভ হলেই আলু বিক্রি করে দিই।’

গত ১৪ সেপ্টেম্বর আলুর দাম খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ৩৫–৩৬ টাকা এবং হিমাগার পর্যায়ে ২৬–২৭ টাকা বেঁধে দেওয়া হয়। তবে ব্যবসায়ীরা এই দর না মেনে হিমাগার পর্যায়ে ৩৯-৪০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৪৫-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে থাকেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জের হিমাগার পরিদর্শনে আসেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। হিমাগার পরিদর্শন শেষে তিনি পরদিন থেকে রসিদের মাধ্যমে ২৬-২৭ টাকা কেজি দরে পাইকারি এবং খুচরা বাজারে ৩৫-৩৬ টাকা দরে আলু বিক্রির নির্দেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলেন মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে।

এরপর শুরুতে প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেছে। বিভিন্ন হিমাগারে অভিযানও চালিয়েছে তারা। তবে মাসখানেক ধরে উপজেলার বাজারগুলোয় প্রশাসনের নজরদারি চোখে পড়েনি। মুন্সিগঞ্জ ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক আবদুস সালাম এবং মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফরের (রিপন) মুঠোফোনে কল করা হলে তাঁরা ধরেননি। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিফা খান দাবি করেন, হিমাগার ও খুচরা বাজারে তাঁদের নিয়মিত তদারকি আছে। আলুর বাজারদর নিয়ন্ত্রণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় ব্যাপকভাবে তদারক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় এ বছর ভোক্তাদের আলুর মোট চাহিদা রয়েছে ৯৫ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন। সেখানে উৎপাদিত হয়েছে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৬৩ মেট্রিক টন। জেলার হিমাগারগুলোতে সোমবার পর্যন্ত মজুত রয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ১৭৭ মেট্রিক টন আলু।

এর মধ্যে বীজ আলু রয়েছে ৬৮ হাজার মেট্রিক  টন। জাতীয় পর্যায়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১১ লাখ ৯১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। দেশে আলুর চাহিদা ৮৯ লাখ ৯২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৯১ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন। সেই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকে অন্তত ২০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি আলু।

আলুর যথেষ্ট মজুত ও উৎপাদন থাকার পরেও বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়ার কারণ কী—এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা এ বি এম মিজানুল হক বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল। এর পরও কেন এমন হলো ঠিক জানা নেই।’