বিকেলে ভিড় জমে যায়। চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। এক মিনিটও বিশ্রামের সুযোগ নেই। দুই হাত চলে সমানতালে। একবার ফুচকা আবার খানেক পরে চটপটি। কখনো চানাচুর ভাজা মাখানো। মাঝেমধ্যে নজর দিতে হচ্ছে ভ্যানগাড়ির সঙ্গে লাগানো ছোট্ট মনিটরে। অনলাইনে আসা ফরমাশ সামাল দিতে হচ্ছে বিক্রেতা তুষার ইমরান ওরফে খোকনকে।
তুষারের ফুচকা–চটপটির দোকানটির অবস্থান কুষ্টিয়া শহরের এনএস রোডে আমলপাড়া গলির মুখে। তাঁর বাড়ি শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকায়। বাবা মৃত হাসান আলী। মায়ের নাম মিনা খাতুন। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক পাস করেছেন। দুই বোনকেও পড়াশোনা করিয়েছেন। পরে তাঁদের বিয়ে দিয়েছেন। একতলা বাড়ি করেছেন। সবই করেছেন ফুচকা–চটপটি বিক্রি করা টাকায়।
এই পথ পাড়ি দেওয়া সহজ ছিল না তুষারের। ফুচকা তৈরির ব্যস্ততার মধ্যে এক বিকেলে কথা হয় তুষার ইমরানের সঙ্গে। জানা গেল, একই জায়গায় তাঁর বাবা ফুচকা বিক্রি শুরু করেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৯২-১৯৯৩ সালের কথা। এরপর ২০১০ সালে হঠাৎ বাবা মারা যান। সে সময় ইমরান উচ্চমাধ্যমিকে পড়তেন। ছোট দুই বোন ঘরে। মাথার ওপর যেন বাজ পড়ল ইমরানের। ফুচকা বিক্রি ধরে রেখে পড়াশোনা চালাতে থাকলেন। ছোট বোনদেরও পড়াশোনা করাতে থাকেন।
তুষার বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হন। প্রতিদিন ক্লাস শেষে ভ্যানগাড়ি নিয়ে এনএস রোডে চলে যান। সেখানে রাত অবধি ফুচকা বিক্রি করে বাড়ি ফেরেন। প্রতিদিনের এই সংগ্রামে চলতে থাকে সংসার। পাশাপাশি পড়াশোনা।
ইমরানের ভ্যানগাড়ির পাশে আরও কয়েকটি অস্থায়ী ভ্যানগাড়ি থাকলেও তাঁর ভ্যানগাড়ির সামনে ভিড় সব সময় লেগে থাকে। বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত অনলাইনে ফরমাশ নেন। এতে সাড়াও বেশ। প্রতিদিন ১০–১৫টি ফরমাশ পান।
তুষার ইমরান বললেন, বাবার মৃত্যুর আগে ভ্যানগাড়িতে ফুচকা তৈরিতে সহায়তা দিতেন। এভাবে বাবার হাত ধরে শেখা ছিল। সেটা বাবার মৃত্যুর পর কাজে দেবে কখনো ভাবেননি। ফুচকা বিক্রির টাকায় দুই বোনের বিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা সুখে আছেন। তিনিও বিয়ে করেছেন।
প্রতিদিন বাড়িতে মা ও স্ত্রী ফুচকা–চটপটি তৈরির উপকরণ প্রস্তুত করে দেন। সেগুলো বিকেলে ভ্যানগাড়িতে করে এনএস রোডে নিয়ে আসেন। টক, মিষ্টি বিভিন্ন ধরনের ফুচকা তৈরিতে পারদর্শী ইমরান। প্রথম দিকে কলেজের সহপাঠীসহ পরিচিতজনেরা এলে বিব্রত হতেন। নিজেকে সামাল দিয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে কাজ করে গেছেন। বন্ধু–বান্ধবীরা ইস্তত বোধ করতেন। হাসিখুশিতে সব মেনে নিতেন।
পাঁচ মাস ধরে ভ্যানগাড়ির সামনে আসা কোরআনের হাফেজ ছোট শিশু–কিশোরদের বিনা মূল্যে চটপটি খাওয়ান ইমরান। এটা তাঁর ভালো লাগে বলে জানালেন। এ ছাড়া এতিম শিশুদের জন্য ‘ফ্রি অফার’ রয়েছে। মনের তৃপ্তিতে এটা করেন তিনি।
পথচারী ছাড়া আশপাশের বিপণিবিতানের ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ক্রেতারা ইমরানের কাছ থেকে ফুচকা-চটপটি খান। অনেক দূর থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে তাঁর কাছে ফুচকা খেতে আসেন। রাতে ফেরার সময় যদি কোনো খাবার বেঁচে যায়, সেগুলো স্থানীয় ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে দিয়ে দেন ইমরান। পরের দিনের জন্য সেগুলো জমা রাখেন না।
আড়ুয়াপাড়ায় বাবার রেখে যাওয়া ছোট একখণ্ড জমিতে তিনতলা ভবনের কাজ শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে একতলা সম্পূর্ণ করে বসবাস করছেন। চাকরি করার ইচ্ছে আছে কি না জানতে চাইলে মৃদু হেসে ইমরান বলেন, ‘এটা আমার ব্যবসা। আমিই উদ্যোক্তা। আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আমিই সব। ইচ্ছেমতো আমি চলি, চলব। কারও অধীনে থাকলে স্বাধীনতা হারিয়ে যাবে, এটা আমি চাই না। এটাতেই আমি বেশ সুখী। এ কাজ আমি ছাড়তে পারব না।’