সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়কের তামাবিল সোনাটিলা আপের মুখ এলাকার বিয়াই রেস্টুরেন্ট। গত বুধবার তোলা
সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়কের তামাবিল সোনাটিলা আপের মুখ এলাকার বিয়াই রেস্টুরেন্ট। গত বুধবার তোলা

হাঁসের মাংসের টানে ‘বিয়াই রেস্টুরেন্টে’ ভোজনরসিকেরা

জাফলং ভ্রমণে যাওয়া-আসার পথে অনেক পর্যটকের যাত্রাবিরতি এখন একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁয়। সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়কের তামাবিলের সোনাটিলা এলাকায় ‘বিয়াই রেস্টুরেন্ট’ নামে পরিচিত এই খাবারের দোকানটি হাঁসের মাংসের জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত এখানে বসার চেয়ার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরাও খাবারের সুঘ্রাণে খেতে চলে আসেন।

সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়কের ‘আপের মুখে’ বাঁ পাশে টিনশেডের ছোট এই রেস্তোরাঁটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৩ বছর আগে। তখন গোয়াইনঘাট উপজেলার মহাসড়কের ডান পাশে ছোট পরিসরে এটি চালু করা হয়। অল্প সময়েই সুস্বাদু খাবারের সুনাম ছড়িয়ে পড়লে ক্রমে বাড়তে থাকে ক্রেতার সংখ্যা। পথচলতি মানুষ, আশপাশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সিলেট শহর থেকে দল বেঁধে আসা ভোজনরসিকদের নিয়মিত গন্তব্য হয়ে ওঠে রেস্তোরাঁটি। চাহিদা বাড়তে থাকায় চার বছর আগে মহাসড়কের বাঁ পাশে তুলনামূলক বড় একটি আধা পাকা ঘর মাসিক ১৬ হাজার টাকা ভাড়া নিয়ে রেস্তোরাঁটি স্থানান্তর করা হয়।

রেস্তোরাঁটির মালিক মুজিবুর রহমান। তবে এলাকার মানুষের কাছে তিনি এখন ‘বিয়াই’ নামেই বেশি পরিচিত। এমনকি ‘বিয়াই’ নামের আড়ালে তাঁর প্রকৃত নামও অনেকটা চাপা পড়ে গেছে। গোয়াইনঘাট উপজেলার মোহাম্মদপুর মামুর দোকান এলাকার বাসিন্দা মুজিবুর রহমানের ছয় সদস্যের পরিবার। তিনি, তাঁর স্ত্রী ও ভাইয়ের ছেলে মিলে রান্নাসহ রেস্তোরাঁর বেশির ভাগ কাজ সামলান।

মুজিবুর রহমান বলেন, প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ জন এখানে খাবার খান। শুক্রবার, শনিবার ও ছুটির দিনে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। রেস্তোরাঁটির প্রধান আকর্ষণ হাঁসের মাংস। প্রতি বাটির দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। মাংস বা অন্যান্য তরকারির সঙ্গে ভাত, ডাল ও সালাদ বিনা মূল্যে পরিবেশন করা হয়। সদ্য খেত থেকে তোলা টমেটো, শসা, পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ কুচি করে খাঁটি শর্ষের তেল দিয়ে তৈরি করা হয় সালাদ। সঙ্গে থাকে করলা, আলু, কাকরোলসহ মৌসুমি সবজির ভাজি এবং স্থানীয় পাহাড়ি লেবু।

এই বিয়াই রেস্তোরাঁটির মালিক মুজিবুর রহমান

এ ছাড়া স্থানীয় খাল, বিল ও হাওর থেকে ধরা তাজা মাছও প্রতিদিন রান্না করা হয়। ট্যাংরাসহ বিভিন্ন ছোট মাছের মিশ্রণে তৈরি একটি তরকারির দাম ১৫০ টাকা। আইড়, বোয়াল ও ইচামাছের (ছোট চিংড়ি) দাম ২০০ টাকা। খাসির মাংস ২৫০ টাকা, গরুর মাংস ২০০ টাকা, গরুর কলিজা ২৫০ টাকা এবং দেশি মুরগির মাংস ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রায়ই পাওয়া যায় চিংড়ি মাছের ভর্তাও। চিংড়ি মাছের ভর্তার দাম ৫০ টাকা।

গত বুধবার সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি টেবিলে ১০ থেকে ১২ জন খাবার খাচ্ছেন। তাঁদের বেশির ভাগের পাতে হাঁসের মাংস। কেউ কেউ ছোট মাছ ও অন্য তরকারিও নিয়েছেন। খেতে খেতে কয়েকজন খাবারের প্রশংসা করছিলেন। রেস্তোরাঁর একজন কর্মী বলেন, সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে ভিড় কমে আসে।

মৌলভীবাজার পৌরসভার বাসিন্দা আকরাম আলী সস্ত্রীক জাফলং ঘুরে ফেরার পথে এখানে খেতে আসেন। তিনি বলেন, ‘বন্ধুদের মুখে রেস্টুরেন্টটির সুস্বাদু খাবারের সুনাম শুনেছি। তাই জাফলং বেড়াতে আসার আগেই এখানে খাবারের পরিকল্পনা করেছি। ফেরার পথে খাওয়ার জন্য এখানে বিরতি নিয়েছি। হাঁসের মাংসের সঙ্গে সতেজ ও টাটকা সালাদ এবং গরম ডালের প্রশংসা অনেক আগে থেকেই আমার জানা।’

রেস্তোরাঁয় খেয়েছেন—এমন কয়েকজন জানান, এখানে ঘরোয়া পরিবেশে রান্না করা হয়। ভাত ও তরকারি সব সময় গরম থাকে। স্থানীয় জলাশয়ের তাজা মাছ, মৌসুমি সবজির ভাজি এবং রান্নার স্বাদই তাঁদের বারবার এখানে টেনে আনে। তাঁদের মতে, এসব কারণেই স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের কাছে রেস্তোরাঁটি আলাদা জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী মুজিবুর রহমান বলেন, তিনি একসময় পানের ব্যবসা করতেন। পরে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় নেমেছেন। হাঁসের মাংসের টানেই মূলত তাঁর রেস্তোরাঁয় ভোজনরসিকেরা ভিড় জমান বেশি। চামড়াসহ এবং চামড়া ছাড়া—দুই ধরনের হাঁসের মাংসই এখানে মেলে।