খুলনায় ভোটারদের দীর্ঘ সারি। পশ্চিম শিরোমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, খুলনা, ১২ ফেব্রুয়ারি
খুলনায় ভোটারদের দীর্ঘ সারি। পশ্চিম  শিরোমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, খুলনা, ১২ ফেব্রুয়ারি

বিএনপির মন্ত্রিসভায় এবারও খুলনার কেউ নেই, ক্ষোভ-হতাশা

খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে মাত্র ১১টি আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। পুরো বিভাগে খারাপ করলেও খুলনা জেলায় ভালো করেছে দলটি। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এখানকার প্রায় ৬৭ ভাগ আসনে জয়ী হয়েছে সদ্য ক্ষমতাসীন দলটি। তবে নতুন মন্ত্রিসভায় খুলনার কারও জায়গা হয়নি। এতে দলীয় নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

দেশের আটটি বিভাগীয় সদরের জেলার মধ্যে এবার খুলনা ও রংপুর থেকে কাউকে মন্ত্রী করা হয়নি। অবশ্য রংপুরের কোনো আসনেই জিততে পারেনি বিএনপি। খুলনার কেউ মন্ত্রিসভায় না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বিষয়টিকে খুলনার প্রতি বৈষম্য হিসেবে বিবেচনা করছেন।

দেশ স্বাধীনের পর এবার নিয়ে পঞ্চমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। অবশ্য এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গঠিত সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক দিন। আগের বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভাগুলোতে খুলনা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অন্তর্ভুক্ত না করায় খুলনার নেতা-কর্মীদের মনঃকষ্ট ছিল। এবার দীর্ঘ বঞ্চনার অবসানের দাবি ছিল নাগরিক নেতা ও দলটির কর্মীদের। তাঁদের সেই আশা পূরণ হয়নি। এবারও ইতিহাসের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে দলটি খুলনার কাউকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেয়নি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে খুলনার ৬টি আসনের মধ্যে বর্তমানের খুলনা-৩ ও ৬ আসনে জয় পান যথাক্রমে বিএনপির মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন ও শেখ রাজ্জাক আলী। ওই নির্বাচনে জেলার অন্য চারটি আসনের দুটি আওয়ামী লীগ ও দুটি মুসলিম লীগের প্রার্থীরা পেয়েছিলেন। সেবারের মন্ত্রিসভায় খুলনার কাউকে রাখা হয়নি। এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খুলনা-২ আসন থেকে বিএনপির শেখ রাজ্জাক আলী ও খুলনা-৩ আসন থেকে মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন জয় পান। অন্য চারটির তিনটিতে জয় পায় আওয়ামী লীগ ও একটিতে জামায়াত। ১৯৯১ সালে শেখ রাজ্জাক আলী খালেদা জিয়ার সরকারে কয়েক দিনের জন্য আইন প্রতিমন্ত্রী হন। ওই বছরই তিনি ডেপুটি স্পিকার ও পরে স্পিকার নির্বাচিত হন।

২০০১ সালে খুলনা-২ আসন থেকে বেগম খালেদা জিয়া, খুলনা-৩ আসন থেকে মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, খুলনা-৪ আসন থেকে এম নুরুল ইসলাম বিএনপির হয়ে জয় পান। খালেদা জিয়া আসনটি ছেড়ে দিলে মোহাম্মদ আলি আসগার লবি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসনটিতে জয় পান। জেলার অন্য তিনটি আসনের একটি আওয়ামী লীগ ও দুটি পায় জামায়াত। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সেবার হুইপ নির্বাচিত হয়েছিলেন। আলি আসগার লবি বিসিবির সভাপতির দায়িত্ব পান।

এবার বিএনপির হয়ে জয়ী হওয়া চার সংসদ সদস্যের মধ্যে কেন্দ্রীয় বিএনপির দুই নেতা রকিবুল ইসলাম ও এস কে আজিজুল বারী হেলাল এবং বিসিবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলি আসগার আছেন। তিনি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে পরাজিত করেছেন। অন্য বিজয়ী খুলনা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান জামায়াতের কৃষ্ণ নন্দীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের কাউকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে নগরের ইকবাল নগর এলাকায় একটি চায়ের দোকানে আড্ডায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে অলোক বৈদ্য নামের একজন ভোটার। তিনি বলেন, বিভাগের মধ্যে বিএনপি সবচেয়ে ভালো করেছে খুলনায়। অথচ বিভাগের কয়েকটি জেলায় মাত্র একটি করে আসনে জয় পেয়ে মন্ত্রিত্ব পেয়েছে। এটা খুলনার মানুষের প্রতি চিরায়ত বঞ্চনার সেই পুরোনো হিসাব। কম করে একজন প্রতিমন্ত্রী তো এখান থেকে দেওয়া যেত।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, বিভাগীয় জেলা হিসেবে মন্ত্রিসভায় খুলনার একটি প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে খুলনা যে বরাবরই বঞ্চনার শিকার এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁরা বিষয়টি নিয়ে হতাশ।

মহানগর বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘উন্নয়নে খুলনা পিছিয়ে পড়া বঞ্চিত একটি জনপদ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভীষণ সীমিত, যার কারণে সামাজিক বিশৃঙ্খলার প্রভাব খুবই মাত্রাতিরিক্ত। তা ছাড়া ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়াতে বঞ্চনা খুলনার অধিবাসীদের মধ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে বেশ জোরালো অভিযোগ বিদ্যমান এবং একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে বিএনপির সমালোচনায় সংগত কারণেই সোচ্চার। সে ক্ষেত্রে এবারের সরকারে মন্ত্রিত্ব প্রাপ্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে খুলনা জেলার এই বঞ্চনা বিএনপির প্রতি মানুষকে আরও অধিক বিরূপ করে তুলতে পারে।’

মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম (মনা) প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের নেতার প্রতি আমাদের আস্থা আছে। আমরা বিশ্বাস করি সঠিক সময়ে উনি খুলনার মানুষকে মূল্যায়ন করবেন এবং খুলনার উন্নয়নের দায়িত্ব তিনি নিজেই নেবেন।’

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা ছিল খুলনায় এবার অন্তত কম করে একজন মন্ত্রী পাবে। তবে দলের চেয়ারম্যান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে আমরা আস্থা রাখছি।’