‘শফিক বাহিনীর’ প্রধান শফিক মিয়া ওরফে ‘ডাকাত শফিক’
‘শফিক বাহিনীর’ প্রধান শফিক মিয়া ওরফে ‘ডাকাত শফিক’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর

‘শফিক বাহিনী’র ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না, র‍্যাব-পুলিশ ধরতে গেলেই হামলা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে এখন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছেন ‘শফিক ডাকাত’। নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, পুলিশ–র‍্যাবের ওপর হামলা, মাদক ব্যবসাসহ নানা অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। এসব অপকর্ম করতে নিজের নামে গড়ে তুলেছেন ‘শফিক বাহিনী’। এই বাহিনীর ভয়ে এলাকার কেউ মুখ খোলার সাহস পান না।

সর্বশেষ গত সোমবার তথ্য সংগ্রহে যাওয়া র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার তিন সদস্যের ওপর হামলা চালিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ‘শফিক বাহিনী’। তবে এবারই প্রথম নয়, এর আগেও ‘শফিক বাহিনী’র লোকজনকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

সোমবারের ঘটনার পর উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের খাগাতুয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে শফিকের পাঁচ সহযাগীকে আটক করে র‍্যাব। মঙ্গলবার রাতে র‍্যাব-৯–এর পরিদর্শক প্রিয়দর্শী চাকমা বাদী হয়ে শফিককে প্রধান করে আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জনকে আসামি করে নবীনগর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় এজাহারে আট আসামির বাইরে আটক পাঁচ সহযোগীর নাম উল্লেখ করা হয়। মঙ্গলবার রাতেই আটক পাঁচজনকে নবীনগর থানা–পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। তাঁদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন নবীনগর উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের খাগাতুয়া গ্রামের আবদুল কাদের (৬২), মো. রাহিম (২০), আবদুর রহমান ওরফে অপু মিয়া (১৮), নূর আলম (১৬) ও তাঁদের সহযোগী ছানোয়ারা বেগম (৪৮)। শফিক মিয়া (৫৫) ওরফে শফিক ডাকাতের বাড়িও একই গ্রামে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নবীনগর থানার উপপরিদর্শক মোবারক আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ (বুধবার) মামলাটি হাতে পেয়েছি। শফিকের বিস্তারিত তথ্য এখনো যাচাই করে দেখিনি। যাচাই না করে ঠিক কয়টি মামলা রয়েছে তা বলা মুশকিল। তবে শফিক পুলিশের ওপর একাধিকার হামলা করেছে বলে শুনেছি। সে সময় আমি এই থানায় ছিলাম না। আমরা তদন্ত শুরু করেছি।’

এক যুগের বেশি সময় ধরে শফিকের নির্যাতন ও অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন রতনপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা মারুফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এলাকায় দুটি দল রয়েছে। তাদের যন্ত্রণায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। একটির নেতৃত্বে রয়েছে ইব্রাহীম নেওয়াজ এবং আরেকটির নেতৃত্বে শফিক মিয়া। ইউনিয়নের মাসিক সভায় বিষয়গুলো নিয়ে বারবার আলোচনা হয়। প্রশাসনকে একাধিকবার বিষয়গুলো জানানো হয়েছে; কিন্তু কেন যে তারা শফিককে গ্রেপ্তার করতে পারছে না বুঝতে পারছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এখানে ব্যর্থ হয়েছে।

এসব বিষয়ে কথা বলে এখন নিজেই নিরাপত্তাহীনতা ভোগেন উল্লেখ করে ইউপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘তার ভয়ে খাগাতুয়া গ্রামের কেউ কথা বলতে ও মামলা করতে চায় না। কথা বললেই হয়তো রাতের অন্ধকারে মেরে ফেলবে।’

‘চোরা শফিক’ থেকে ‘ডাকাত শফিক’

এলাকার একাধিক জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় দুই ব্যক্তি নাম না প্রকাশ করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, শফিকরা চার ভাই। শফিক এলাকায় আগে ছোটখাটো চুরি করতেন। এরপর হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসার মতো অপকর্মেও জড়িয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তিনি ‘ডাকাত শফিক’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এখন এলাকায ‘শফিক বাহিনী’ নামে তাঁর ২০-২৫ জনের একটি দল আছে। ধীরে তার বাহিনী খাগাতুয়া গ্রামে ভয়ের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে। এখন গ্রামে বাড়ি নির্মাণ ও সালিসসহ সবকিছুতেই তাঁর নিয়ন্ত্রণ।

২০২১ সালের গত ২৫ নভেম্বর সকালে নবীনগর উপজেলায় পূর্ববিরোধ ও ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় খাগাতুয়া গ্রামের মঙ্গল মিয়ার ছেলে যুবলীগ কর্মী মাসুদ মিয়া (৪৫) নিহত হন। হামলাকারীরা কুপিয়ে এবং পায়ুপথে রড ঢুকিয়ে তাঁকে হত্যা করেছে। ঘটনার দিন রাতেই হত্যার ঘটনায় নিহতের ভাই মো. ইব্রাহিম নেওয়াজ ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা তিন থেকে চার ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন।

পুলিশকে কামড়ান শফিকের সহযোগী হালিম

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৮–১০ বছর ধরে শফিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন তাঁর অন্যতম প্রধান সহযোগী আবদুল হালিম (৩৫)। তিনি রতনপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ও একই ইউনিয়নের খাগাতুয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় একটি হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও পুলিশ আহতের ঘটনায় ছয়–সাতটি মামলা রয়েছে।

২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর রাতে একাধিক মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি আবদুল হালিমকে গ্রেপ্তার করতে খাগাতুয়ায় গ্রামে যান নবীনগর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) বাছির আহমেদ ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশরাফুল আরিফ। গ্রেপ্তার করতে গেলে দুই পুলিশ সদস্যকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কামড় দিয়ে এবং পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে পালিয়ে যায় হালিম। পুলিশ সদস্যকে আহত করার ঘটনায় সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়।

২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর সন্ধ্যায় নবীনগর থানার তৎকালীন ওসি মো. হুমায়ূন কবিরের নেতৃত্বে পুলিশের ১২ সদস্যের একটি দল খাগাতুয়া গ্রামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি আবদুল হালিম ওরফে হালিম মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায়। বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে ভ্যানে ওঠানোর সময় হালিমের পক্ষের লোকজন পেছন থেকে অতর্কিতে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সে সময় নবীনগর থানার ওসি মো. হুমায়ূন কবিরের বাঁ হাতের কবজিতে কামড় দিয়ে পালিয়ে যায় হালিম। বাধা দেওয়াসহ গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলে তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নাসির উদ্দিনকে দা দিয়ে মাথায় কোপ দেন। এ ঘটনায় তৎকালীন এসআই শামিম বাদী হয়ে ৩৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

‘শফিক বাহিনী’ নিয়ে কথা বলতে ভয়

নাম প্রকাশ না করার শতে৴ দুই জনপ্রতিনিধি প্রথম আলোকে বলেন, শফিক এত ভয়ানক এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁর বিষয়ে কথা বলার সাহস ও ভাষা সাধারণ মানুষের নেই। গ্রেপ্তার করতে যাওয়ায় পুলিশের ওপর দুইবার হামলা করেছেন। এর পরও তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। র‍্যাবও তাঁর কাছে পরাভূত হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, খুন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যে শফিক পারে না।

ডাকাতি, হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে শফিকের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া র‍্যাব-৯-এর কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নুরনবী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই এলাকায় শফিক ও তার বাহিনী একচ্ছত্র প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করে আছে। যেকোনো সময় যখন খুশি যে কারও বাড়িতে তারা যায়, ভাঙচুর ও লুটপাট করে। কেউ তাদের কিছু বলতে পারে না। তাদের ১৫-২০ জনের একটি দল আছে। দিনের পর দিন এসব করে যাচ্ছে। ওই গ্রামের অবস্থা এমন হয়েছে যে ওদের বাড়ির ঠিকানাই কেউ বলে না। এমনকি পাশের বাড়ির লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলেও বলে, তারা কেউ তাকে চেনে না। গ্রামের কেউই শফিক ও বাহিনী সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে চায় না।’

নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোর্শেদুল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শফিক মিয়া প্রকৃত অর্থেই একজন চিহ্নিত ডাকাত ও খারাপ প্রকৃতির লোক। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। তিনি থানায় নতুন এসেছেন। শফিকের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।