
পোলট্রি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত খামারিরা বলছেন, হাঁস-মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম এত বেড়েছে যে তাঁরা লাভের মুখ দেখছেন না। এ অবস্থায় তাঁদের অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। গত এক বছরে গাইবান্ধার সহস্রাধিক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে পোলট্রি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রথম আলো কথা বলেছে গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মাসুদার রহমানের সঙ্গে।
বর্তমানে হাঁস-মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম বাড়ায় পোলট্রি শিল্পের ওপর প্রভাব পড়ছে। গাইবান্ধার পোলট্রির খামারিরা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। পোলট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আপনারা কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
মাসুদার রহমান: আমরা মার্কেটিংয়ের কাজ করি না। আমরা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। মুরগির খাবার, ওষুধ, এক দিনের বাচ্চা, শ্রমিক খরচ ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার বিষয়ে আমাদের হাত নেই। এসবের দাম যেভাবে বাড়ছে, এটার ওপর ভিত্তি করে মুরগি ও ডিমের দামও বাড়ানো উচিত। কিন্তু এগুলোর দাম বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। তখন হইচই শুরু হবে। পোলট্রি শিল্প যাতে টিকে থাকে, সে জন্য খামারিদের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছি।
৬ মাস আগে ৫০ কেজির প্রতিটি পোলট্রি খাদ্যের বস্তা ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা বিক্রি হতো। বর্তমানে ৫০ কেজির প্রতিটি বস্তা ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। খামারিদের দাবি অনুযায়ী, এসব খাবারের দাম কমানোর কোনো উপায় কি আছে?
মাসুদার রহমান: খাবারের দাম কমানোর বিষয়টি আমাদের ওপর নির্ভর করে না। কারণ, খাবারের দাম সারা বছর এক থাকবে না। এটা আমদানি পণ্য। এই খাবারের অধিকাংশ উপাদান আমদানি করতে হয়। খাবারের অনুপাতে হেরফের হলে ডিম উৎপাদন কম হবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের মুরগির খাবারের দাম বেশি।
গাইবান্ধার চারটি উপজেলার চরাঞ্চলে হাঁস-মুরগির খাবারের অন্যতম উপাদান ভুট্টা প্রচুর পরিমাণে হচ্ছে। কিন্তু গাইবান্ধায় হাঁস-মুরগির খাবার তৈরি হয় না। স্থানীয়ভাবে হাঁস-মুরগির খাবার উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে কি?
মাসুদার রহমান: গাইবান্ধার চরাঞ্চলে ভুট্টা প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছে, এটা ঠিক। কিন্তু সেটা চাহিদার তুলনায় কম। দেশে বার্ষিক ভুট্টার চাহিদা ৭০ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু উৎপাদিত হচ্ছে ৫৫ হাজার মেট্রিক টন। বছরে এই ফসলের চাহিদা ১৩ শতাংশ। ভুট্টাও আমাদের আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া শুধু ভুট্টার ওপর ভিত্তি করে খাদ্য উৎপাদন সম্ভব নয়। কারণ, মুরগির খাদ্য উৎপাদনের অন্যান্য উপাদানের বেশির ভাগ আমদানি করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন কোম্পানি বা উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা দরকার। আমরা স্থানীয়ভাবে খাদ্য তৈরি করতে আগ্রহী উদ্যোক্তা বাড়ানোর কাজ করছি।
বিগত এক বছরে গাইবান্ধার বন্ধ হয়ে যাওয়া পোলট্রি ফার্মগুলো চালুর জন্য কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন?
মাসুদার রহমান: জেলার ৭টি উপজেলায় হাঁস–মুরগির খামার আছে ২ হাজার ৮২৭টি। এর মধ্যে ব্রয়লার ১ হাজার ৩টি, লেয়ার ১ হাজার ২৬৪টি ও হাঁসের খামার ৫৬০টি। তবে এখানে স্থায়ীভাবে খামার বন্ধ হয় না। খাবারের দাম বাড়লে ও ও মূলধনের অভাবে কিছু কিছু খামার মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকছে। পরে সেগুলো আবার চালু হচ্ছে। বিশেষ করে যখন ডিমের দাম কমে এবং খামারের অন্যান্য জিনিসের দাম বাড়ে, তখন এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোরবানি ঈদের সময় ঘরে ঘরে মাংস থাকায় ডিমের চাহিদা কমেছিল।
গাইবান্ধার পোলট্রি খামারের মালিকদের ব্যবসা লাভজনক করতে বা মূলধনের জোগান দিতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে প্রণোদনা কিংবা ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে?
মাসুদার রহমান: সরকার করোনাকালে জেলার হাঁস-মুরগির খামারিদের প্রায় ১১ কোটি টাকা প্রণোদনা দেয়। এরপর আর প্রণোদনা আসেনি। তবে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা আছে। খামারিরা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আমরা তাঁদের সহযোগিতা করছি।
গাইবান্ধার পোলট্রি শিল্পের ব্যবসায় প্রধান অন্তরায় কী?
মাসুদার রহমান: খামার করার সময় উদ্যোক্তারা ভুল করেন। একজন খামারি কতগুলো মুরগি পালন করবেন, সে অনুপাতে পুঁজি কত লাগবে, তা হিসাব না করেই শুধু লাভের আশায় ব্যবসা শুরু করেন। অনেকের কারিগরি অভিজ্ঞতা নেই। তাঁরাও হঠাৎ করে মুরগির খামার দেন। এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায় না। অনেক সময় কাজ করতে করতে শ্রমিকেরা চলে যান। তখন খামারিরা বিপাকে পড়েন।
গাইবান্ধার পোলট্রি শিল্পের উন্নয়নে প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মাসুদার রহমান: পোলট্রি নীতিমালা অনুযায়ী এখানে এই শিল্প গড়ে উঠছে। এ শিল্পের উন্নয়নে উদ্যোক্তাদের পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মুরগি পালনে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। যেসব খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন, তাঁদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী আবার ব্যবসায় ফিরতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।