ময়মনসিংহে উৎকট দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে মিলল সাত দিন ধরে নিখোঁজ এক যুবকের বিচ্ছিন্ন মাথা। পরে পাশের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় তাঁর মাথাবিহীন মরদেহ। বুধবার রাত পৌনে নয়টার দিকে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে।
নিহত যুবকের নাম সোহেল মিয়া (২৬)। তিনি ময়মনসিংহ সদরের পরানগঞ্জ ইউনিয়নের মীরকান্দাপাড়া নূরুল ইসলাম ও জুলেখা বেগম দম্পতির সন্তান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয় ছিলেন। এলাকায় তিনি গাছ কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
স্বজনেরা জানায়, ১৬ জুলাই রাত আটটার দিকে নিজ বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সোহেল মিয়া নিখোঁজ হন। এর পর থেকে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করলেও তাঁর কোনো সন্ধান পাননি। এ ঘটনায় বুধবার সকালে নিহত যুবকের বাবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।
সোহেল মিয়ার বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরের অম্বিকাগঞ্জ কলেজের একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের স্থান নির্বাচনের কাজ চলছিল। জায়গার মাপজোখ করছিলেন কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী। এ সময় উৎকট দুর্গন্ধ ভেসে আসছিল। এর উৎস খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় সোহেলের মাথা ও দেহের অবশিষ্ট অংশ।
কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মো. মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেলা পৌনে তিনটার দিকে সেখানে গিয়ে দেখি আমাদের সীমানাপ্রাচীর ভাঙা ও দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সেই দুর্গন্ধের কারণ খুঁজতে গিয়ে চারদিকে খোঁজ করতেই মানুষের মাথা দেখতে পাই। পরে তাৎক্ষণিক বিষয়টি থানা–পুলিশকে অবহিত করলে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পুলিশ আসে। এটি এলাকার নিখোঁজ যুবকের ছিল বলে পরিবার শনাক্ত করেছে। নিখোঁজের ঘটনায় থানায় জিডিও করা ছিল।’
ওই মাথা ও দেহ নিখোঁজ যুবক সোহেলের। পিবিআইয়ের মাধ্যমে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে এ পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া শরীরের কাপড় দেখে মরদেহটি সোহেলের বলে নিশ্চিত করেছেন তাঁর পরিচারের সদস্যরা। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।আশরাফুল করিম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম), ময়মনসিংহ
মাথাটি পাওয়া যায় ঘাসের ওপর। পাশেই নরম মাটিতে ছিল শিয়াল, কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণীর আঁচড়ের দাগ। ধারণা করা হচ্ছে, গর্ত থেকে কোনো প্রাণী মাথাটি টেনে তুলে ফেলেছে। এর ফলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে বিচ্ছিন্ন মাথাটি উদ্ধার করে। পরে মরদেহের বাকি অংশের সন্ধানে পাশেই মাটি খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। একপর্যায়ে মাটির ভেতর থেকে দুটি গ্লাভস পাওয়া যায়। রাত পৌনে নয়টার দিকে কয়েক ফুট গভীরে পাওয়া যায় মাথাবিহীন দেহ।
বিচ্ছিন্ন মাথা ও অবশিষ্ট দেহ উদ্ধার করা করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম। আঙুলের ছাপ থেকে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিতের জন্য পিবিআইকে ডাকা হয়। এ ছাড়া ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আশরাফুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ওই মাথা ও দেহ নিখোঁজ যুবক সোহেলের। পিবিআইয়ের মাধ্যমে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে এ পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া শরীরের কাপড় দেখে মরদেহটি সোহেলের বলে নিশ্চিত করেছেন তাঁর পরিচারের সদস্যরা। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
নিহত সোহেলের শ্বশুর আলাল উদ্দিনের ভাষ্য, ১৬ জুলাই রাত আটটার পর সোহেলের ভগ্নিপতি সেলিম মিয়া কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। এর পর থেকেই তাঁকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সোহেল ও সেলিম একসঙ্গে গাছ কাটার কাজ করলেও পারিশ্রমিক নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ ছিল। সোহেলকে ঠিকমতো টাকা না দিয়ে মারধরও করতেন সেলিম। এ জন্য ঢাকায় গিয়ে নির্মাণশ্রমিকের কাজ শুরু করেছিল সোহেল। বাড়িতে আসার খবর পেয়ে সোহেলকে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁকে ডেকে নেন সেলিম। মঙ্গলবার এলাকা থেকে তিনি পালিয়ে যান।
আলাল উদ্দিন বলেন, এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে একটি বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পেয়ে তাঁরা পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। এরপর মরদেহের বাকি অংশও উদ্ধার হয়। শরীরে কাপড় দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে মরদেহটি সোহেলের।