
জুতা পালিশের কাজ শেষে পাশে রাখা একটি পত্রিকা হাতে নিলেন অনন্ত চন্দ্র দাস (৪১)। নীরবে পড়তে থাকলেন পত্রিকার বিভিন্ন লেখা। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা সদরের ভবানীগঞ্জ বাজারের ফুটপাতে এমন দৃশ্য ২৩ বছর ধরে দেখে আসছেন স্থানীয় লোকজন। পেশায় চর্মকার অনন্তর নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাসই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে ভবানীগঞ্জ উপজেলা সড়কের পাশে দেখা হয় অনন্তর সঙ্গে। তিনি জানান, কাজের ফাঁকে পত্রিকা পড়েন। কোনো খবর আকর্ষণীয় মনে হলে সেটি পরে নিরিবিলিতে পড়ার জন্য রেখে দেন।
অনন্তর ছোটবেলা থেকেই পত্রিকা পড়ার আগ্রহ। ২০০৩ সালে নিয়মিত পত্রিকা কেনা শুরু করেন। তখন এলাকায় চরমপন্থীদের তৎপরতা ও খুনের ঘটনা ঘটত। স্থানীয় পত্রিকায় এসব ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশিত হতো। সেসব জানার আগ্রহ থেকেই পত্রিকা কেনা শুরু করেন তিনি। তখন দুই টাকা দামের স্থানীয় পত্রিকা কিনতেন। এখনো সেই অভ্যাস ধরে রেখেছেন।
অনন্ত জানান, প্রতিদিন সকালে দোকানে যাওয়ার পর হকারের কাছ থেকে পত্রিকা নেন। কাজের চাপ কম থাকলে গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো পড়ে নেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় পত্রিকাটি ব্যাগে করে নিয়ে যান। হাতে পত্রিকা দেখলে কেউ ঠাট্টা করতে পারে, এই আশঙ্কায় এমনটি করেন তিনি।
পেপার পড়া আমার নেশা ও অভ্যাস হয়ে গেছে। না পড়লে ভালো লাগে না। পত্রিকা পড়াতে কোনো পেশার প্রয়োজন হয় না। আগ্রহই যথেষ্ট।অনন্ত চন্দ্র দাস
অনন্তর ভাষায়, ‘পেপার পড়া আমার নেশা ও অভ্যাস হয়ে গেছে। না পড়লে ভালো লাগে না।’ করোনা মহামারিতে তাঁর খুব কষ্ট হয়েছিল। কয়েক দিন পত্রিকা বন্ধ থাকায় এবং ব্যবসা না হওয়ায় তখন বিপাকে পড়েন অনন্ত। তাঁর ভাষ্য, ‘পত্রিকা পড়াতে কোনো পেশার প্রয়োজন হয় না। আগ্রহই যথেষ্ট।’ এই পেশাকে খাটো করে দেখেন না তিনি।
দোকানে পত্রিকা থাকলে অনেক খদ্দেরকে ধরে রাখা যায় বলে জানান অনন্ত। তিনি বলেন, জুতা পালিশে যতটুকু সময় লাগে, তখন খদ্দেরের হাতে পেপার ধরিয়ে দিলে তিনি পড়ে সময় পার করেন। এতে করে নিজের পড়ার পাশাপাশি অন্যকেও পড়ানো যায়।
অনন্ত লেখাপড়া চতুর্থ শ্রেণির পর এগিয়ে নিতে পারেননি। বাপ-দাদার পেশাই ধরে রেখেছেন। প্রতিদিন জুতা পালিশ করে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করেন। সংসারের খরচ মিটিয়ে মাসে ১০০ টাকা পত্রিকা কেনার জন্য রাখেন।
দীর্ঘদিন ধরে পথের ধারে অনন্তকে পত্রিকা পড়তে দেখে আসছি। তাঁর এই অভ্যাস আমাকে মুগ্ধ করেছে।রেজাউনাল করিম, ভবানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক
অনন্তকে দীর্ঘদিনের নিয়মিত ক্রেতা উল্লেখ করে ভবানীগঞ্জ বাজারের পত্রিকা বিক্রেতা সঞ্জয় কুমার কুণ্ডু বলেন, পত্রিকা পৌঁছাতে দেরি হলে তিনি নিজেই দোকানে এসে পত্রিকা নিয়ে যান।
ভবানীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক রেজাউনাল করিম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পথের ধারে অনন্তকে পত্রিকা পড়তে দেখে আসছি। তাঁর এই অভ্যাস আমাকে মুগ্ধ করেছে।’
অন্যের জায়গায় কুঁড়েঘর বানিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন অনন্ত। তাঁর একমাত্র চাওয়া, নিজের থাকার একটু জায়গা। সরকারি ঘরের জন্য চেষ্টা করেও তা পাননি।
গণিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুস সোবহান মণ্ডল বলেন, অনন্ত তাঁদের ওয়ার্ডের বাসিন্দা। উপজেলা প্রশাসন চাইলে তাঁকে সহযোগিতা করতে পারে।