ক্রেতাদের দেখানো হচ্ছে কারদানা জামদানি। গত মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের পাথরাইলের তাঁতপল্লি এলাকায়
ক্রেতাদের দেখানো হচ্ছে কারদানা জামদানি। গত মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের পাথরাইলের তাঁতপল্লি এলাকায়

পূজায় টাঙ্গাইলের কারদানা জামদানিতে মুগ্ধ ক্রেতা

হাফ সিল্কের জামদানি শাড়িতে পুঁতির কারুকাজ—নতুন এই শাড়ির নাম ‘কারদানা জামদানি’। টাঙ্গাইলের তাঁতে তৈরি এই শাড়ি এবার দুর্গাপূজার বাজারে ক্রেতাদের নজর কেড়েছে। ক্রেতারা এত আকৃষ্ট হবেন, তা ধারণা করতে পারেননি শাড়িশিল্পীরা। ফলে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এই শাড়ি নিতে আগ্রহী হলেও সময়সাপেক্ষ কারুকাজের কারণে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছেন না তাঁতিরা।

প্রতিবছর ঈদ, দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলের শাড়ির চাহিদা দেশজুড়ে বেড়ে যায়। তাই এসব উৎসব সামনে রেখে নতুন নকশার শাড়ি তৈরি করেন এখানকার তাঁতশিল্পীরা। এ বছর কোরবানির ঈদে খুব স্বল্প পরিমাণে ‘কারদানা জামদানি’ তৈরি করা হয়েছিল। সে সময় এ শাড়ি ক্রেতাদের তেমন দৃষ্টি কাড়েনি। তবে এই শাড়ি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার–প্রচারণা চলে। এতে এবার পূজায় ক্রেতারা এসে খুঁজছেন কারদানা জামদানি।

‘শাড়ির রাজধানী’–খ্যাত টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল। শাড়ি তৈরি ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এখানকার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পূজার বাজারের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা টাঙ্গাইল থেকে বিভিন্ন ধরনের শাড়ি নিয়ে যান। নেওয়ার পর সব জায়গা থেকেই খবর আসতে থাকে, কারদানা জামদানি ভালো চলছে। তাঁরা এই শাড়ি আরও নেওয়ার কথা জানান।

এবার দুর্গাপূজায় কারদানা জামদানি শাড়ির প্রচুর বিক্রি হয়েছে। মঙ্গলবার দেলদুয়ারের পাথরাইলের তাঁতপল্লি এলাকায়

শাড়িশিল্পীরা বলেন, একটি হাফ সিল্ক জামদানি শাড়ির ওপর ছোট ছোট পুঁতি, দানা বা দানার মতো অলংকরণ বসিয়ে এই কারদানা জামদানি শাড়ি তৈরি করা হয়।

টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও পাথরাইলের যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং–এর মালিক রঘুনাথ বসাক বলেন, এবারের পূজার বাজারে কারদানা জামদানি বিক্রি করে টাঙ্গাইলের তাঁতিরা লাভবান হচ্ছেন। এ ছাড়া অন্য শাড়িরও চাহিদা রয়েছে।

গত মঙ্গলবার পাথরাইল তাঁতপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা চলছে। বিভিন্ন বাড়িতে, বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে মানুষ শাড়ি কিনছেন। মির্জাপুর থেকে আসা শেফালী সরকার বলেন, ‘টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ছাড়া দুর্গাপূজার কথা চিন্তাই করা যায় না। তাই শাড়ি কিনতে পাথরাইলে চলে এসেছি। এবার সাধারণ শাড়ির পাশাপাশি কারদানা জামদানি বেশি ভালো লেগেছে। কিন্তু দামটা অনেক বেশি।’

পাথরাইলের সীতানাথ-রঞ্জিত বস্ত্রালয়, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং, বসাক বস্ত্রালয়, টাঙ্গাইল তাঁত কুটির, তারাপদ শাড়িসহ সব প্রখ্যাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কারদানা জামদানি তৈরি করেছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, পুরো শাড়িতে কারদানা করা একটি জামদানি মানভেদে সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। আবার শুধু আঁচল ও বডিতে কাজ করা শাড়ি ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া, যশোরসহ যেসব স্থানে এই শাড়ি গেছে, সেখানেই এর ব্যাপক চাহিদার কথা শোনা যাচ্ছে। একটি হাফ সিল্ক জামদানি শাড়িতে পুঁতি বসিয়ে কারদানা করতে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত সময় লাগে। তাই চাহিদা থাকার পরও সময়ের অভাবে সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

শাড়ি ব্যবসায়ী সুবীর বসাক বলেন, ‘অনেক বছর পর এবার টাঙ্গাইলের একটি শাড়ির ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে। সেটি হচ্ছে কারদানা জামদানি। আমার প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রায় ৮০০ কারদানা জামদানি সরবরাহ করেছি। তৈরি থাকলে আরও পাঁচ শতাধিক শাড়ি সরবরাহ করা যেত। কিন্তু সময়ের অভাবে চাহিদা থাকার পরও সরবরাহ করা যচ্ছে না।’

মাগুরার সাহা বস্ত্রালয়ের মালিক রেন্টু সাহা বলেন, ‘কারদানা জামদানির অনেক চাহিদা রয়েছে পূজার বাজারে। কিন্তু আমাদের চাহিদামতো টাঙ্গাইলের উৎপাদকেরা সরবরাহ করতে পারছেন না।’

এ বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রামের টেরী বাজারের শাড়ি ব্যবসায়ী শিপলু মিয়ার সঙ্গে। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের অঞ্চলেও এবার কারদানা জামদানির খুব চাহিদা রয়েছে।

কয়েকজন শাড়ি ব্যবসায়ী বলেন, কারদানা জামদানির পাশাপাশি এবার পূজায় পাথরাইলে উৎপাদিত ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা মূল্যের হাফ সিল্ক শাড়ি, ১২ শ থেকে ৩ হাজার টাকা মূল্যের মাসলাইস কটন, ১৫ শ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকার টাঙ্গাইল জামদানি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেছে। এ ছাড়া এবার নতুন উৎপাদিত ঝুল বাঁধা সুতি শাড়িও প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।

টাঙ্গাইল চেম্বর অব কমার্সের পরিচালক বিশ্বজিৎ কুমার সাহা বলেন, টাঙ্গাইলের শাড়ি ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এবারের পূজায় টাঙ্গাইলের কারদানা জামদানি ভালো বাজার পেয়েছে। এটা আনন্দের সংবাদ।