
তিন মাস আগে দিনাজপুর আঞ্চলিক সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা বরাবর জমির রেকর্ড সংশোধনের মামলা করেছিলেন আরিফ হোসেন (৩৮)। এরই মধ্যে দুবার শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু কার্যালয়ে সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা না থাকায় মামলার শুনানি হয়নি। কবে নাগাদ শুনানি হবে, মামলার নিষ্পত্তি হবে, তা–ও জানতে পারছেন না তিনি।
আরিফের বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায়। পেশায় তিনি একজন মৎসচাষি। আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় জেলা সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় আরিফ বলেন, ‘বড় স্যার নাই, শুনানি হয়নি। আসি আসি ঘুরে যাছি।’
সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে সেবাপ্রত্যাশীদের কেউ এসেছেন মাঠ জরিপের চূড়ান্ত নথিতে দাগ, খতিয়ান নম্বরের ভুল সংশোধনের আবেদন করতে, কেউ এসেছেন ৪২–এর (ক) ধারায় শুনানিতে হাজিরা দিতে। সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা। আড়াই মাস ধরে সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।
এর আগে ২৬ এপ্রিল আঞ্চলিক সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে রিভিউ শুনানির রায়ের অনুলিপি পেতে দেরি হওয়ায় সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার টেবিলে এক সেবাপ্রত্যাশী ফাইলপত্র ছুড়ে মারেন। এ সময় ওই সেবাপ্রত্যাশীর সঙ্গে বহিরাগত কয়েকজনের ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী নূরুল আমিন বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখসহ পাঁচ–ছয়জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে একটি মামলা করেছিলেন। বর্তমানে তাঁরা জামিনে আছেন।
এ ঘটনার পর ৫ মে তৎকালীন আঞ্চলিক সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা শাহীনুর ইসলামকে জামালপুরে পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে পরিচালক পদে বদলি করা হয়। তার পর থেকেই শূন্য সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার পদ। তবে বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেহেনুমা তারান্নুম।
দিনাজপুর সদর উপজেলার বালুবাড়ি এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রেকর্ডে নাম সংশোধনের আবেদন করেছি। প্রায় দেড় মাস হয়ে গেল। ছোট একটা কাজ। কিন্তু শুধু ঘুরতেছি। এর আগে বলছিল ঈদের আগে হবে। আজকে বলতেছে জুলাইয়ের আগে হবে না।’
এদিকে আঞ্চলিক সেটেলমেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণসহ নানা অভিযোগ তুলছেন সেবাপ্রত্যাশীদের অনেকে। কার্যালয়ে সারাক্ষণই দালাল চক্রের ভিড় লেগে থাকে। বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন দালাল চক্রের সদস্যরা। কার্যালয়ের অধস্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেন ও তদবির করেন তাঁরা। প্রথমবার শুনানি শেষে যদি বাদী রায় পান, বিবাদী আপিল করলে শুনানি শেষে আবার রায় উল্টে যায়। এ ধরনের ঘটনায় প্রায়ই কার্যালয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
রোববার দিনাজপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা জান্নাতুল ইসলাম বলেন, ‘ছয় মাস ধরে রেকর্ড সংশোধনীর কাজে ঘুরছি। নোটিশ দেয় কিন্তু শুনানি হয় না। আজকাল বলে ঘোরায়। স্যার থাকিলেও পাইসা ছাড়া কোনো কাম হয় না।’
সেবাপ্রত্যাশীদের সেবা না পাওয়ার বিষয়ে রেহেনুমা তারান্নুম বলেন, ‘জেডএসও (জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার) স্যার নেই। আমি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। অফিসের রুটিন কাজ ব্যতীত শুনানি ও মামলাসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ স্থগিত আছে। কবে নাগাদ জেডএসও পদায়ন করা হবে এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিষয়। তবে যেহেতু দিনাজপুর একটি বড় জোন, হয়তো দ্রুততার সঙ্গেই জেডএসও পদায়ন হবেন।’