দীর্ঘ ৩৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে যশোরে এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান বিএনপিকে ভাবিয়ে তুলেছে। ১৯৯১ সালের পর যে জামায়াত ‘ভোট কাটার’ দল বা জোটের শরিক হিসেবে ছিল, এবারের নির্বাচনে সেই দলটিই যশোরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সমান্তরালে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভোটের রাজনীতিতে যশোরের ছয়টি আসনের পাঁচটিতেই বিজয়ী হয়েছে দলটি।
বিশেষ করে যশোর-১ (শার্শা) আসনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াতের প্রার্থী আজীজুর রহমান প্রায় ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটনকে পরাজিত করেছেন। দীর্ঘদিনের জোট ভেঙে এককভাবে নির্বাচন করা বিএনপি ও জামায়াতের জন্য আশীর্বাদ ও চ্যালেঞ্জ—উভয়ই বয়ে এনেছে।
সীমান্তবর্তী এ আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী নূর হোসেন ৩৩ হাজার ১৮ ভোট এবং বিএনপির প্রার্থী আলী কদর ২০ হাজার ৬১৮ ভোট পেয়েছিলেন। সেবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী তবিবর রহমান সরদার ৩৬ হাজার ৭৪৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আলী কদরের ভোট বেড়ে দ্বিগুণ হয়। তিনি পান ৪০ হাজার ৬৩৩ ভোট। ভোট কিছুটা কমলেও জামায়াতের প্রার্থী আজীজুর রহমান পান ৩২ হাজার ২৮৪ ভোট। সেবারও আওয়ামী লীগের তবিরব রহমান সরদার নির্বাচিত হন।
২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয়। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপির আলী কদর নির্বাচিত হন। পরেরবার ২০০৮ সালে চারদলীয় জোটের প্রার্থী বদল করে জামায়াতের আজীজুর রহমানকে মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ আফিল উদ্দীনের কাছে অল্প ভোটের ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন।
তিন দশক আগে ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭১৯ জন। তখন একক নির্বাচন করে জামায়াত পেয়েছিল ৩২ হাজার ২৮৪ ভোট ও বিএনপি পেয়েছিল ৪০ হাজার ৬৩৩ ভোট। এখন এ আসনের ভোটার দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার। এবার জামায়াতের প্রার্থী আজীজুর রহমান ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪২ ভোট। ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতের এই উত্থান বিএনপিকে ভাবিয়ে তুলেছে।
পরাজয়ের কারণ জানতে চাইলে বিএনপির খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর-৩ (সদর) আসনের বিজয়ী প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজনৈতিক এই বিপর্যয়ের কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী দিনে হারানো জমিন ফিরে পেতে আমাদের অনুসন্ধান করতেই হবে। আমরা ইতিমধ্যে দলীয় বিভিন্ন ইউনিটে আলোচনা করেছি। কী কী কারণে এমন পরাজয়, সেটা খোঁজার চেষ্টা করছি। ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে।’
এবার প্রাথমিকভাবে শার্শার এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন দলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান (তৃপ্তি)। এক মাস গণসংযোগের পর তাঁকে সরিয়ে শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। দলের এ সিদ্ধান্তে মফিকুল হাসানের অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হন। তাঁরা বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামেননি। অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন বলে নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে পরাজিত প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন প্রথম আলোকে বলেন, মনোনয়নবঞ্চিত মফিকুল হাসান ও শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে কাজ করেননি। উল্টো দুজনের অনুসারীরা এক হয়ে নির্বাচনের আগের রাতে জামায়াতের প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট কিনেছেন। দলীয় কোন্দলের পাশাপাশি জামায়াতের মহিলা কর্মীরা তালিমের নামে গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারীদের দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার জন্য কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করিয়েছেন। এতে তাঁদের অনেক নারী সমর্থককেও তাঁদের পক্ষে নিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মফিকুল হাসান (তৃপ্তি) প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পর এক মাস মাঠে সভা-সমাবেশ করেছেন। গণসংযোগ করে মানুষকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করার পর তাঁকে বদল করে আরেকজনকে মনোনয়ন দেওয়া হলো। যাঁকে স্থানীয় লোকজন ঠিকমতো চেনেন না। এরপরও তিনি তাঁর অনুসারীদের ধানের শীষে ভোট দিতে বলেছেন।
বিএনপির প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে জামায়াতের বিজয়ী প্রার্থী আজীজুর রহমানের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি মো. সাহাবুদ্দিন বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, গত ১৫ বছর তাঁদের দলীয় কার্যালয় বন্ধ থাকলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল ছিল। জামায়াতের কর্মীদের আয়ের ৫ শতাংশ ইয়ানত (মাসিক চাঁদা) হিসেবে দলীয় তহবিলে জমা দিতে হয়। ওই টাকার ৪০ ভাগ সামাজিক কাজে ব্যয় হয়। এটাই তাঁদের ভোট বৃদ্ধির মূল ভিত্তি। তাঁরা মানুষের কল্যাণে সামাজিক কাজ করেছেন। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ তাঁদের ভোট দিয়েছে।