
সমুদ্রপথে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন বক্তারা। তাঁরা বলেছেন, মানব পাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
রোববার সকাল ১০টা থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন সেন্ট্রাল রিসোর্টের সম্মেলনকক্ষে গণমাধ্যমকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে পৃথক দুই দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের অর্থায়নে কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
প্রথম পর্বের কর্মশালায় টেকনাফ ও উখিয়ার ৪২ জন সাংবাদিক অংশ নেন। মানব পাচার, অভিবাসী চোরাচালান এবং সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন সম্পর্কে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশে স্থানীয় সাংবাদিকদের সক্ষমতা বাড়ানো ছিল কর্মশালার অন্যতম উদ্দেশ্য।
কর্মশালায় অভিবাসনের বর্তমান প্রবণতা এবং মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান। মানব পাচার নিয়ে নিজের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি মানব পাচার কিংবা মাদকের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, একদিন আপনার আমার সন্তানেরাও এর শিকার হবেন। তখন দেখবেন এই এলাকাই ছাড়তে হবে। কাজেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা শুধু তথ্য তুলে ধরে না, এটি মানুষকে সচেতন করে, ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখে এবং নিরাপদ অভিবাসনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
মানব পাচারের তদন্ত, অপরাধ চক্রের কার্যক্রম এবং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোমেনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘মানব পাচার থেকে কি রাষ্ট্র লাভবান হয়? ফরেন কারেন্সি আসে? দেশের অর্থনীতি লাভবান হয়? আমরা ভাবছি একবার যেতে পারলে দেশে টাকা আসে। কিন্তু আসলে কি আসে? আসলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় হ্রাস পায়, অর্থটা বিদেশেই রয়ে যায়। পাচারের অর্থে পাচারকারী দলের শক্তি বৃদ্ধি পায়। পাচারের অর্থ মাদকের মতো ক্ষতিকর পণ্য ক্রয়ে ব্যবহৃত হয় আর তা বাংলাদেশের ভেতরেই আসে। আর সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।’
মোমেনা আক্তার বলেন, ‘আমাদের একার পক্ষে কি এটা প্রতিরোধ সম্ভব? এটা আপনার–আমার সবার বিষয়। সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিষয়। আর এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা অনেক বেশি। এই কর্মসূচিতে যদি একজন সাংবাদিকও সচেতন হয়, তাহলে একজনের হয়তো জীবন বাঁচবে। নিজের জায়গা থেকে চিন্তা করতে হবে। আমার ছেলে হলে কি হতো?’
তিন দশকের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমরা একদম মানব পাচারের ঘাটের মধ্যে বসে আছি, যেই ঘাট থেকেই সমুদ্রপথে মানব পাচার হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা মানব পাচারের মূল জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা সাংবাদিকেরা কক্সবাজারের সীমানা রক্ষা করতে পারছি না। টেকনাফ উপকূল দিয়ে ২৮০ জনের বেশি মানববোঝাই ট্রলার আন্দামান সাগরে গিয়ে ডুবে গেল। এই ডুবির ঘটনা নিয়ে বিদেশি সংস্থায় আগে রিপোর্ট হলো। টেকনাফের সাংবাদিকেরা ট্রলারে মানুষ তোলার খবর জানলেন না। আমাদের এত ভয় কিসের? ভয় পেলে চলবে না। এখানে আমাদের অনেক দায়িত্ব।’
বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের কক্সবাজারের সমন্বয়কারী (লিগ্যাল সার্ভিস) বিশ্বজিৎ ভৌমিক কক্সবাজারের মানব পাচার-সংক্রান্ত মামলাগুলোর বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। কর্মশালায় মানব পাচারের শিকার হয়ে ফিরে আসা টেকনাফের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাবের তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানান।
কর্মশালায় মানব পাচার, অভিবাসী চোরাচালান ও অনিয়মিত অভিবাসনের পার্থক্য, বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর হয়ে পরিচালিত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথের বাস্তবতা, স্থানীয় প্রেক্ষাপট, নৈতিক সাংবাদিকতা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক প্রতিবেদন এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা এ বিষয়ে মুক্ত আলোচনাতেও অংশ নেন।
বিকেলে সমুদ্রপথে মানব পাচার প্রতিরোধে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক পৃথক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোমেনা আক্তার বলেন, মানব পাচার ও মাদকের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের ধরতে হবে।
কর্মশালায় কক্সবাজারের উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রকিবুল হাসান, র্যাব-১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার সোহেল রানা এবং প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুস বক্তব্য দেন। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম টেকনাফকে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের একটি ‘রেড জোন’ হিসেবে উল্লেখ করে এ অঞ্চলে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা সমুদ্রপথে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আন্তসংস্থার সমন্বয়, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও সেবাদান এবং পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।
কর্মশালায় বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), আনসার ও ভিডিপিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।