
একতলা বাড়িটি ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের। ছাদজুড়ে প্লাস্টিকের ছোট–বড় ড্রাম কেটে সারি সারি বসানো হয়েছে দেশি–বিদেশি নানা প্রজাতির ফলগাছ। আছে ফুলের গাছও। জামালপুর শহরের শাহপুর এলাকার এই ছাদবাগান গড়ে তুলেছেন তানজিদ ইসলাম (২৬)।
ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী তানজিদ। তিনি তোফাজ্জল হোসেন ও মনোয়ারা বেগম দম্পতির ছোট ছেলে। স্কুলজীবন থেকেই গাছের প্রতি তাঁর আকর্ষণ। সেই টান থেকেই একটু একটু করে গড়েছেন বাগানটি। এখন সেখানে প্রায় ৭০ ধরনের ফলদ ও ৫০ ধরনের ফুলগাছ আছে।
ফলের মধ্যে রয়েছে কমলা, আঙুর, পেয়ারা, মাল্টা, চেরি, সফেদা, জাম, আনার, ডালিম, সবুজ আপেল, ড্রাগন, লেবু প্রভৃতি। এ ছাড়া ফুলের মধ্যে রয়েছে গোলাপ, জবা, রঙ্গন, বাগানবিলাস, হাসনাহেনা, বেলি, কাঁটামুকুট, কাঠগোলাপ প্রভৃতি।
সেদিন মা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। মায়ের মন খারাপ দেখে আমিই তখন বলেছিলাম, চলো, ফুল লাগবে না। একদিন আমিই নিজের একটি বাগান করব।তানজিদ ইসলাম, ছাদবাগানি
একটি ফুল না পেয়ে বাগান শুরুর জেদ
গল্পের শুরু ২০১২ সালে। তানজিদ তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাবেন, তাই আগের দিন সন্ধ্যায় মায়ের কাছে ফুলের বায়না ধরেন। ছেলের আবদার রাখতে মা তাঁকে নিয়ে যান এক প্রতিবেশীর ফুলের বাগানে। কিন্তু বাগানমালিক একটি ফুলও দিতে রাজি হননি।
ঘটনাটি তানজিদের মনে গভীর দাগ কাটে। তিনি বলেন, ‘সেদিন মা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। মায়ের মন খারাপ দেখে আমিই তখন বলেছিলাম, চলো, ফুল লাগবে না। একদিন আমিই নিজের একটি বাগান করব।’
স্বপ্ন ছিল, কিন্তু জায়গা ছিল না। তাঁদের বাড়ি ছিল টিনশেডের। তবু দমে যাননি তানজিদ। বিভিন্ন নার্সারিতে ঘুরেছেন। যাঁদের বাড়িতে বাগান আছে, তাঁদের কাছে গিয়ে পরিচর্যা ও গাছ লাগানোর কৌশল শেখার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি ইউটিউবে দেখেছেন বাগান তৈরির নানা পদ্ধতি। ধীরে ধীরে গাছের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে।
সুযোগ আসে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। ওই মাসে তাঁদের একতলা বাড়ির ছাদঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়। ছাদ তৈরির পরদিন থেকেই বাগানের প্রস্তুতি শুরু করেন তানজিদ। জোগাড় করতে থাকেন টব, মাটি, সারসহ নানা উপকরণ। এরপর একে একে ছাদে জায়গা করে নেয় ফুল ও ফলের গাছ। দেখতে দেখতে পুরো ছাদ ভরে ওঠে সবুজে।
গাছের পরিচর্যা নিয়ে আগে তেমন ধারণা ছিল না তানজিদের। টবে গাছ লাগানো, সার দেওয়া, পরিচর্যা—বেশির ভাগ কাজ শিখেছেন ইন্টারনেটের সহায়তায়। তিনি বলেন, ‘গাছের প্রতি ভালোবাসা আর সেদিনের ঘটনাটি আমাকে একরকম জেদি করে তুলেছিল। সেই জেদ থেকেই আজকের এই বাগান।’ তাঁর দাবি, বাগানে এমন কিছু বিদেশি গাছ আছে, যা জেলার আর কারও কাছে নেই।
আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ফুল–ফল দেন
মৌসুমে গাছে এত ফল ধরে আর ফুল ফোটে যে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পরও উদ্বৃত্ত থাকে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরাও পান বাগানের ফল–ফুল। চাইলে বাজারে বিক্রি করা যায়, কিন্তু সে ইচ্ছা নেই তানজিদের। তিনি বলেন, ‘নিজের হাতে লাগানো গাছের ফল খেতে এবং সবাইকে খাওয়াতে অনেক ভালো লাগে। এতে মানসিকভাবেও একধরনের প্রশান্তি ও তৃপ্তি পাচ্ছি।’
জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনের সামনে থেকে শাহপুর–বোর্ডগড় সড়ক ধরে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৮০০ মিটার এগোলে জামতলা মোড়ের বাঁয়ে তানজিদের বাড়ি। গত ৩১ অক্টোবর দুপুরে তাঁদের বাড়ির ছাদে গিয়ে দেখা যায়, ছোট–বড় টবে নানা রকম ফল ও ফুলের গাছ। বেশির ভাগ গাছে এখন ফল নেই, তবে পরিচর্যা চলছে। অনেক গাছেই ফুল ফুটেছে। গোলাপি রঙের বাগানবিলাস আর জবা ফুলে ছাদজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোরম পরিবেশ।
পরিবারের আনন্দের জায়গা
শুরুতে ছেলের এই উদ্যোগে খুশি ছিলেন না তানজিদের মা মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে ছেলে যখন অনেক ছেলেপেলে নিয়ে ছাদে মাটি এনে বাগান করা শুরু করে, তখন বকাঝকা করতাম। বলতাম, এত পরিশ্রম করে কী লাভ? তবে ধীরে ধীরে ছাদবাগানটি যখন সুন্দর হয়ে উঠতে শুরু করল, আমাদেরও ভালো লাগতে লাগল।’
মনোয়ারা বলেন, ‘ফরমালিনমুক্ত ও নিরাপদ ফল খেতে পারছি, এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। এখন ছেলের এই ছাদবাগান আমাদের পরিবারের সবার আনন্দের জায়গা হয়ে উঠেছে। ছাদজুড়ে গাছপালা থাকায় বাড়িও বেশ ঠান্ডা থাকে।’ বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে পরিবেশ দেখে প্রশংসা করেন বলেও জানান তিনি।
ছাদবাগান কেন জরুরি
জামালপুরের পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে শহরে গাছপালা ও জলাধার কমছে, বাড়ছে কংক্রিটের স্থাপনা। ফলে বাড়ছে তাপমাত্রা, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। এ পরিস্থিতিতে ছাদবাগান হতে পারে কার্যকর প্রকৃতিনির্ভর উদ্যোগ।
জাহাঙ্গীরের মতে, প্রতিটি ভবনের ছাদে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো হলে বাড়ির সৌন্দর্য বাড়বে, চারপাশের তাপমাত্রা কমবে। কমবে বায়ুদূষণ, বাড়বে অক্সিজেন সরবরাহ, রক্ষা পাবে জীববৈচিত্র্যও। তরুণদের গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় উৎসাহিত করতে পারলে তাঁদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও পরিবেশসচেতনতা তৈরি হবে। তাই ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষকে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
প্রথম দিকে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল তানজিদের। ছাদে মাটি আনা, গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে বাগানটি বড় হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি চাই, প্রত্যেকে নিজের বাড়ির ছাদ বা খালি জায়গায় অন্তত কয়েকটি গাছ লাগান। এতে পরিবেশ সুন্দর হবে, শহরের তাপ কমবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।’