
কুমারখালী উপজেলায় ৫০০ টন করলা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি।
জমির আলের চারপাশে নীল জালের বেড়া। ভেতরে বাঁশ ও জালের মাচা। মাচার ওপরে সবুজ লতা। আর নিচে থোকায় থোকায় ঝুলছে তরতাজা করলা। চাষিরা বলছেন, এসব করলায় নেই কোনো কীটনাশক ও রাসায়নিক বিষ।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় প্রথমবারের মতো উত্তম কৃষিচর্চা বা গ্যাপ পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে সাড়া ফেলেছেন দুই কৃষক। ফলন ভালো হলেও বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় মলিন তাঁদের মুখ।
ওই দুই কৃষক হলেন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ধলনগর গ্রামের দবির উদ্দিন ফারাজী ও আবদুল বারী। তাঁরা তিন বিঘা জমিতে আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন। গত ১০ দিনে তাঁরা ২ হাজার ২০০ কেজি করলা বিক্রি করেছেন। স্থানীয় বাজারে পাইকারি দর ছিল প্রতি কেজি ৩০–৫৫ টাকা। এতে ৬৫–৭০ হাজার টাকা আয় হয়েছে তাঁদের।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দেড় মাসে আরও চার হাজার কেজির বেশি করলা বিক্রির আশা করছেন তাঁরা, যার বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লক্ষাধিক টাকা। তাঁদের ভাষ্য, বিষমুক্ত সবজির আলাদা বাজার বা হাট নেই। ফলে সমান দামে বিক্রি হওয়ায় লাভবান হতে পারছেন না তাঁরা। গত বছর এ সময়ে প্রতি কেজি করলা ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে বর্তমান প্রতি কেজি ৩০–৫৫ টাকা। গতবারের মতো দাম থাকলে কয়েক লাখ টাকা লাভ হতো।
বিষমুক্ত চাষে বাড়তি খরচ
গত বুধবার বিকেলে উপজেলা শহর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরের ধলনগর মাঠে সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো জমি নীল রঙের জাল (নেট) দিয়ে ঘেরা। পোকামাকড় দমনে ব্যবহার করা হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ এবং জৈব বালাইনাশক। মাটিতে দেওয়া হয়েছে জৈব সার। একজন পরিচর্যা করছেন খেত, অপরজন তুলছেন করলা। এ সময় কৃষি উদ্যোক্তা দবির উদ্দিন বলেন, গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করতে খরচ বেশি। জাল, ফাঁদ, জৈব সার—সবই কিনতে হয়। কিন্তু ফলন ভালো এবং সবজিও স্বাস্থ্যকর। তবে ক্রেতারা এখনো বিষমুক্ত সবজির আলাদা দাম দিতে চান না।
আরেক উদ্যোক্তা আবদুল বারী বলেন, বাজারে বিষমুক্ত করলা সমান দামে বিক্রি করে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। তাঁরা চান, বাজারে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার হোক। তাহলে মানুষ বুঝে কিনতে পারবেন এবং তাঁরাও ন্যায্য দাম পাবেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় প্রায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০০ টন করলা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি। এখানে আধুনিক ও মালচিং পদ্ধতিতে করলার চাষ করা হচ্ছে।
ধলনগর গ্রামের কৃষক উজ্জ্বল চৌধুরী প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে হরেক রকম ফসল চাষাবাদ করে থাকেন। তিনি বলেন, গত বছর আট কাঠা জমিতে করলার চাষ ছিল তাঁর। প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ করে ৬০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন। অল্প খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এ বছর তিনি ১০ কাঠা জমিতে করলার চাষ করেছেন। এক সপ্তাহে তিনি ৯০ কেজি করলা বিক্রি করেছেন।
৫২ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে * গত বছর এ সময় প্রতি কেজি করলার দাম ছিল ৭০-৮০ টাকা * এ বছর পাইকারি প্রতি কেজি ৩০–৫৫ টাকা
উত্তম কৃষিচর্চা
উত্তম কৃষিচর্চা বা গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) হলো এমন কিছু পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক কৃষিপদ্ধতি, যার মূল লক্ষ্য নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা। পরিবেশের ভারসাম্য ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা। কৃষকদের কাজের নিরাপদ পরিবেশ ও সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি করা।
মালচিং পদ্ধতি
মালচিং হলো এমন একটি কৃষিপদ্ধতি, যার মাধ্যমে গাছের গোড়ায় বা মাটির উপরিভাগে খড়, পাতা, কচুরিপানা বা প্লাস্টিকের শিট দিয়ে একটি সুরক্ষা স্তর বা ঢাকনা তৈরি করা; যা আর্দ্রতা রক্ষা, আগাছা দমন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মাটির ক্ষয়রোধ ও পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করে।
২০ শতাংশ জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে নাবিলা ও আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের কৃষক আবদুল মাজেদ। তিনি বলেন, চারা রোপণের ৪০ দিন পরই ফল ধরা শুরু হয়েছে। প্রতি বিঘায় ৩৫-৪০ হাজার টাকা খরচে প্রায় ৫৫-৬০ মণ করলা উৎপাদিত হচ্ছে। তবে গতবারের তুলনায় দাম কম থাকায় লাভ সীমিত হচ্ছে।
হাটে বিষমুক্ত সবজির আলাদা কর্নার স্থাপনের দাবি জানিয়ে পান্টি তহবাজারের আড়তদার মিলন হোসেন বলেন, ২০ দিন আগে ৫৫-৬০ টাকা কেজি করলা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে পাইকারি দাম প্রতি কেজি ৩০-৩৫ টাকা।
কৃষি বিভাগ যা বলছে
উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. বিল্টু হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে উত্তম কৃষিচর্চা এবং অবশিষ্ট জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে করলা চাষ করেছেন কৃষকেরা। কম সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় শুধু ধলনগর গ্রামে প্রায় ২১ বিঘা জমিতে করলার চাষ হয়েছে। বাজারে পৃথক কর্নার করা গেলে বিষমুক্ত সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ হতেন কৃষকেরা।