হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিল সাত বছরের অনুশ্রী দাশ। হাতে স্যালাইন। ডেঙ্গু আক্রান্ত অনুশ্রীর সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দিয়ে তার বাবা লিখেছিলেন—‘মেয়েকে এমনভাবে দেখে কষ্টে আমার বুক ভেঙে যায়।’ মেয়ের জন্য ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে সবার কাছে ‘দোয়া-আশীর্বাদ’ চেয়েছিলেন বাবা। তবে হাসপাতাল থেকে আর সুস্থ হয়ে ফিরতে পারেনি অনুশ্রী। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার।
অনুশ্রী চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলীর রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবা সুবল চন্দ্র দাশ একজন দন্তচিকিৎসকের সহকারী। পাহাড়তলীর মাস্টার লেনেই তাদের বাসা।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৪ সেপ্টেম্বর জ্বর আসে অনুশ্রীর। স্থানীয় একজন চিকিৎসককে দেখানোর পর ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো হয়। পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চলছিল। শুরুতে শারীরিক অবস্থা ভালোই ছিল।
শুক্রবার হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে অনুশ্রীকে নগরের ওয়্যারলেস মোড় এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা দ্রুত তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরিবারের সদস্যরা আইসিইউ শয্যার জন্য একের পর এক হাসপাতালে যোগাযোগ করতে থাকেন। তিন-চারটি হাসপাতালে ঘুরেও শয্যা পাওয়া যায়নি। পরে সন্ধ্যায় পাহাড়তলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে অনুশ্রীকে ভর্তি করা হয়। পরদিন সকালে সেখানে মৃত্যু হয় অনুশ্রীর।
অনুশ্রীর বাবার বন্ধু সুজন চন্দ্র দাশ প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটির অবস্থা খারাপ হওয়ার পর আইসিইউর জন্য কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কোথাও শয্যা পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই সকালে অনুশ্রীর মৃত্যু হয়।
মেয়ের অসুস্থতার প্রতিটি মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে যাচ্ছিলেন তার বাবা সুবল। দুই দিন আগে মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার মেয়ে ডেঙ্গুতে এমনভাবে আক্রান্ত হয়েছে, মামণি খুব কষ্ট পাচ্ছে। ডাক্তাররা ভরসা দিচ্ছেন না।’
এরপর মেয়ের জন্য প্রার্থনার আবেদন জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘যাঁদের বাসায় পূজার আসন আছে, আর যাঁরা আমার মুসলিম ভাইবোন আছেন, সবার কাছে হাতজোড় করে বলছি, আমার অনুশ্রীর জন্য আশীর্বাদ করবেন। মুসলিম ভাইয়েরা মসজিদে গিয়ে দোয়া করবেন।’
জ্বরে কাবু হয়ে অনুশ্রী তখন ঠিকমতো খেতেও পারছিল না। বাবার হাতে খেতে ভালোবাসত মেয়েটি। সেই স্মৃতিও লিখেছিলেন সুবল। ফেসবুকে লেখেন—‘আমার আদরের মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। বাবার হাতে খেতে মেয়ে কত পছন্দ করত। আজকে দুদিন ওর মুখে কিছুই তুলে দিতে পারছি না। খাবারের প্রতি ওর এত অনীহা।’
মেয়েকে বুকে জড়িয়ে একটি ছবিও দিয়েছিলেন সুবল। ছবির সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘জন্ম দেওয়া অনেক সহজ। সত্যিকারের বাবা হওয়া অনেক কঠিন। কত চিন্তা ওকে নিয়ে।’ কিন্তু সেই চিন্তার শেষটা যে এমন হবে, তা হয়তো ভাবেননি তিনি। শনিবার সকালে অনুশ্রী মারা যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র কয়েকটি শব্দ লিখেছেন সুবল চন্দ্র দাশ—‘আমার মেয়ে অনুশ্রী আর নেই।’
এরপর মেয়েকে শেষবারের মতো সাজিয়ে বিদায় দিয়ে আসেন তিনি। শেষবিদায়ের ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘আমার মামণি অনুশ্রীকে কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিলাম। বাবার কত আদরের মেয়ে ছিল। ঈশ্বরের চরণে শেষবিদায় দিয়ে আসলাম।’