
‘কালকে (বুধবার) বেলা ১১টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়ে ৪টার দিকে বলল মাল (চাল) নাই। ফিরে গেছি। আজ (বৃহস্পতিবার) আবার ২০ টাকা ভ্যান ভাড়া দিয়ে আসলাম। কিন্তু আসল চালই দিলো না। লসই তো হলো। পাঁচ কেজি চাল পালি খাওয়া যাতোনে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভা চত্বরে টিসিবির পণ্য কিনতে এসে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন সরস্বতী সরকার। তিনি পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এলংগী এলাকার নারায়ণ সরকারের স্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, ৫৭০ টাকায় ৫ কেজি চাল, ২ কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক লিটার সয়াবিন তেল, একটি বিউটি সোপ ও একটি লন্ড্রি সোপ দেওয়ার কথা। কিন্তু ডিলার ৩৯০ টাকায় ডাল, চিনি ও তেল দিয়েছেন, চাল দেননি।
ভ্যানচালক ফজল শেখ বলেন, ‘কাল (বুধবার) লোকের বহুত চাপ ছিল বলে চলে গেছি। আজ (বৃহস্পতিবার) দেখছি চাল দিচ্ছে না। চাল তো আমাদের বাজেটে ছিল। সেই চালডা গেল কোনে? আমরা ভ্যানচালক। কষ্টের মধ্যেই থাকি। চালডা হলে তো একটা সপ্তাহ পার করতে পারতাম।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালী পৌরসভায় মোট এক হাজার ৪৮১টি টিসিবি কার্ড রয়েছে। বিপরীতে চারজন টিসিবির ডিলার আছেন। এই চারজনকে আবার বরাদ্দ অনুযায়ী চাল সরবরাহ করে থাকেন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির (ওএমএস) চারজন ডিলার। বরাদ্দ অনুযায়ী জুন মাসে প্রতিটি কার্ডে পাঁচ কেজি করে চাল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, দুই লিটার সয়াবিন তেল এবং দুই ধরনের সাবান দেওয়ার কথা। গত বুধবার তিনজন ডিলার চালসহ বরাদ্দকৃত পণ্য বিক্রি করেছেন। তবে রোহান স্টোর নামের ডিলার চাল ও সাবান বাদে বাকি পণ্য বিক্রি করেছেন। তাঁর কাছে ৩৭১ জন কার্ডধারী চাল ছাড়া সবকিছুই পেয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌর কার্যালয়ের নিচতলার বারান্দায় টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। চাল ও সাবান ছাড়াই ৩৯০ টাকায় ডাল, তেল ও চিনি বিক্রি হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা। এলংগী এলাকার শফিকুলের স্ত্রী বিলকিস খাতুন বলেন, ‘সরকার মাসে একবার যাই দিক চালডায় কাজে লাগে। কিন্তু সেই চালই ডিলার দিচ্ছে না। সামনে যেন আগে চাল দেয় সেই ব্যবস্থা করেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রোহান ট্রেডার্সের মালিক ফিরোজ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে দাবি করে বলেন, চাল সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ডিলার তাঁকে চাল দেননি। এ জন্য কার্ডধারীদের চাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
চাল সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন ফাহিম এশরাক নামে একজন ডিলার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত ২১ জুন চালের বিপরীতে চাহিদাপত্র (ডিও) দেওয়ার শেষ সময় ছিল। ওই দিন চালের জন্য ব্যাংকের মাধ্যমে টাকাও জমা দেওয়া হয়। কিন্তু রোহান ট্রেডার্সের মালিক চাল নিতে অনীহা দেখান। তাঁর সঙ্গে এরপর আরও দুই দফায় যোগাযোগ করা হয়, কিন্তু তিনি আর ফোন ধরেননি। বিষয়টি উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ও গুদাম কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়। পরে তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে প্রায় ৯ দিন পর গত বুধবার ওই চাল আরেক টিসিবির ডিলারকে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, চাল না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কার্ডধারী প্রত্যেককে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল বিক্রি করা নিশ্চিত করা হবে। আর যাঁদের গাফিলতিতে এ রকম ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের শোকজ করা হচ্ছে, লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে।