নিহত মো. হৃদয়
নিহত মো. হৃদয়

কুমিল্লায় অন্য দুই যুবকের প্রেমসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সংঘর্ষে নিহত হন অটোচালক: পুলিশ

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. হৃদয় (২১) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ বলছে, মোটরসাইকেলকে সাইড দেওয়া বা কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধ নয়; বরং এক গৃহবধূর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষে নিহত হন হৃদয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত রাজীবসহ অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান।

এর আগে গতকাল বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নের ধোড়করা বাজার এলাকায় হৃদয় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত হৃদয় ওই ইউনিয়নের শাকতলা গ্রামের মৃত হেদায়েত উল্ল্যার ছেলে। ঘটনার পর তাঁর বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, মোটরসাইকেলকে সাইড দেওয়া নিয়ে দুই তরুণের মধ্যে হওয়া বিরোধের জেরে সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং হৃদয়কে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। তবে পুলিশের দাবি, ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে দুই তরুণের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ। ওই নারীর স্বামী প্রবাসে থাকেন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুসারে শাকতলা গ্রামের রাকিব ও ঘোষতল গ্রামের প্রান্ত—দুজনেরই ওই নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। হৃদয় ছিলেন রাকিবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

পুলিশ বলছে, কিছুদিন ধরে ওই নারীর সঙ্গে রাকিবের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রাকিবের ধারণা ছিল, প্রান্তের কারণেই ওই নারী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। এ নিয়ে প্রান্তের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয় রাকিবের। এর জেরে গতকাল রাতে রাকিব তাঁর কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে ধোড়করা বাজার এলাকায় যান। সেখানে প্রান্তপক্ষের লোকজনের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় প্রান্তপক্ষের রাজীব নামের এক যুবক ধারালো অস্ত্র দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়।

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আকিব মাহমুদ বলেন, রাত সাড়ে নয়টার দিকে হৃদয়কে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর বুকের ডান পাশে ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল। হাসপাতালে আনার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্বজনদের দাবি, নিহত হৃদয় কারও পক্ষে ছিলেন না। বন্ধুর সঙ্গে থাকা অবস্থায় সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁরা দ্রুত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় আজ সকালে নিহত হৃদয়ের বড় ভাই ফারুক হোসেন বাদী হয়ে চৌদ্দগ্রাম থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।

ওসি মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন বলেন, ঘটনার পরপরই রাতভর অভিযান চালিয়ে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন প্রান্ত ও পানসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধান আসামি রাজীবকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগে জসিম উদ্দিন নামের আরেকজনকে আটক করা হয়েছে। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে প্রান্ত ও পানসী মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। জসিমকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ওই গৃহবধূকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

ওসি দাবি করেন, ঘটনার পর হৃদয়ের বন্ধু রাকিব বিভিন্ন মাধ্যমে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন। প্রথমে মোটরসাইকেলের সাইড দেওয়া নিয়ে বিরোধ এবং পরে কিশোর গ্যাংয়ের হামলার কথা প্রচার করা হয়। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এ তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে, ঘটনার মূল কারণ প্রেমসংক্রান্ত বিরোধ। হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজীব। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নিহত হৃদয়ের বড় ভাই ফারুক হোসেন বলেন, ‘দুই পক্ষের বিরোধের সঙ্গে আমার ভাইয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সে অটোরিকশাচালক। গতকাল সন্ধ্যায় আমার কাছ থেকে চা খাওয়ার জন্য কিছু টাকা নিয়ে বের হয়েছিল। পরে খবর পাই, তাকে ছুরিকাঘাত করেছে। আমরা গরিব ও নিরীহ মানুষ। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।’