
ঘড়ির কাঁটায় সকাল আটটা। সেজেগুজে বিদ্যালয়ে হাজির দ্বিতীয় শ্রেণির সুমাইয়া; পায়ে আলতা, কপলে টিপ আর লাল-সাদা শাড়ি। ‘এত সকালেই’—প্রশ্ন করতে সুমাইয়া একগাল হেসে বলল, ‘আজ পয়লা বৈশাখ। স্কুলে তো মেলা হবে, অনুষ্ঠান।’ এটুকু বলেই সে দৌড়ে মাঠে চলে গেল।
বাগেরহাট শহরতলির চিতলী-বৈটপুর এলাকার উদ্দীপন বদর-সামছু বিদ্যানিকেতনে আজ মঙ্গলবার সুমাইয়ার মতো নানা বয়সী শিক্ষার্থীরা হাজির হয় বৈশাখের সাজে। শিশুশিক্ষার্থীদের সঙ্গে আসেন অভিভাবকেরাও।
মাঠের দক্ষিণ প্রান্তে বেশ জটলা। সেখানে দোলনা, স্লিপার নিয়েও খেলায় ব্যস্ত একদল শিশু। প্রথমে দেখলে মনে হবে, এগুলোয় উঠতে টিকিট লাগছে। হ্যাঁ, লাগছে ঠিকই। তবে সেই টিকিট কিনতে টাকা লাগছে না। গাছের পাতাই সেখানে টিকিট। কয়েক শিক্ষার্থী মিলে নিজেরাই করেছে এ আয়োজন। যারা রাইডগুলোয় চড়তে চাইছে, সবাই মাঠের পাশে বিভিন্ন আগাছার পাতা নিয়ে আসছে। সেই টিকিটে মিলছে খেলার সুযোগ।
কিছুপর শুরু হলো বর্ষবরণ শোভাযাত্রা। শিক্ষার্থী–শিক্ষকেরা বর্ণিল সাজে গ্রামের পথে প্রদক্ষিণ করেন। বিদ্যালয়ে ফিরে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। নাচে-গানে উৎসবের আবহ। বেলা গড়িয়ে দুপুর হতেই শুরু হলো বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। মূল একাডেমিক ভবন ছেড়ে শত শত শিক্ষার্থী এসে জড়ো হলো পূর্ব দিকের সাইক্লোন শেল্টার ভবনের নিচের ফাঁকা জায়গায়। সেখানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। শুরুতে বসল প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আছে ব্যবস্থাপনায়। শিক্ষকদের সহায়তায় সবার সামনে পৌঁছে গেল কলাপতা। খাবার হিসেবে ছিল খিচুড়ি। মেঝেতে বসে কলাপাতায় খাবার, গ্রামবাংলার একসময়ের ঐতিহ্য হলেও শিক্ষার্থীদের কাছে ছিল জীবনে প্রথমবারের অভিজ্ঞতা।
পয়লা বৈশাখের এ ব্যতিক্রমী আয়োজনে অংশ নেয় বিদ্যালয়টির সাড়ে ৫০০ শিক্ষার্থী। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাবেয়া আক্তার বলে, ‘আমরা শুনেছি, কলাপাতায় নাকি আগে দাওয়াতে খাবার দিত, কিন্তু কখনো দেখিনি। আজ আমরা সবাই কথাপাতায় খেলাম; খাওয়ালাম। এটা দারুণ একটা অভিজ্ঞতা।’
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী যুথী আক্তার বলেন, ‘এই গ্রামেই আমাদের বাড়ি। এখান থেকেই এসএসসি পাস করেছি। আমরা অনেকেই এসেছি আজকের আয়োজনে। সবার খুব ভালো লাগছে। একসঙ্গে মিলে কিছু কাজে জুনিয়রদের সহায়তা করছি।’
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাইজুল ইসলাম বলে, ‘খুব মজা হয়েছে। কলাপাতায় কখনো খাইনি। আমি তো ভাবছিলাম, কী করে খাব? পরে সমস্যা হয়নি। মনে হচ্ছিল, যেন স্কুলে পিকনিক হচ্ছে।’
সামসউদ্দিন-নাহার ট্রাস্ট নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে উদ্দীপন বদর-সামছু বিদ্যানিকেতন পরিচালিত হয়। এখানে প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান কার্যক্রম চলমান। ট্রাস্টের প্রধান সমন্বয়ক সুব্রত কুমার মুখার্জি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ। নানা আয়োজনে আমরা প্লাস্টিকের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেট-গ্লাস ব্যাবহার করি। কিন্তু ঐহিত্যগতভাবে আমরা পরিবেশ সম্মত পণ্য ব্যবহার করে আসছি। কথাপাতা, মাটির পাত্রসহ অনেক কিছু আছে, যা এখন হারাতে বসেছে। আমরা চেয়েছি, আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে অকৃত্রিমভাবে উপস্থাপন করতে। সেই সঙ্গে আগামী প্রজন্মের সঙ্গে এই অনুষঙ্গগুলোর সেতুবন্ধ তৈরি করতে। সেই চিন্তা থেকেই নববর্ষের মধ্যাহ্নভোজ প্লেটের পরিবর্তে সেই কলাপাতায় খাবার পরিবেশন।’