
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সংসদীয় আসনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর চেয়ে ‘না’ ভোট বেশি পড়েছে। তিন আসনে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ২৫ হাজার ৯০৩ জন। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৯১ জন। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’–এর চেয়ে ‘না’ ভোট বেশি পড়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪১২টি।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গণভোটের ফলাফল নিয়ে ২০২৪–এর জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে অংশ নেওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণ প্রজন্ম এবং নাগরিক সমাজের ১০ জনের সঙ্গে আলাপ হয় প্রথম আলোর প্রতিনিধির।
তাঁরা বলছেন, যে জুলাই সনদের ওপর গণভোট হয়েছে, সেখানে পাহাড়ের মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। সবচেয়ে বড় ব্যাপার পাঁচ দশক ধরে বিরাজমান পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে জুলাই সনদে কোনো কিছু উল্লেখ নেই। নিজেদের কোনো কিছু না থাকার প্রতিবাদ এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের সংস্কার হবে অনিশ্চয়তা ও ভীতি থেকে পাহাড়ের মানুষ গণভোটে ‘না’–এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
তিন আসনে এগিয়ে ‘না’
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাহাড়ের তিন আসনের সবগুলোতে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। তাঁরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পরাজিত করেন।
গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘না’ ভোট পড়েছে সবচেয়ে বেশি রাঙামাটি আসনে। সেখানে না ভোট পড়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৫টি, ‘হ্যাঁ’ ভোট ৭১ হাজার ৭১৯ ভোট। বান্দরবানে ‘না’ ভোট ৯০ হাজার ১৫৬ ও ‘হ্যাঁ’ ৭১ হাজার ৪১৭ ও খাগড়াছড়িতে ‘না’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪২, ‘হ্যাঁ’ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫৫ ভোট পড়েছে।
বান্দরবানে মারমা ভাষার লেখক ও গবেষক মংক্য শোয়েনু নেভী বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থানে পাহাড়ে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে। তাই জুলাই সনদ নিয়ে ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’ প্রবাদের মতো হয়েছে। সংবিধান সংস্কারে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়ে কী ধরনের সংশোধনী হবে তা নিশ্চিত নয়। এ কারণে জুলাই সনদের বিপক্ষে ‘না’ ভোট দিয়ে মূলত সংস্কারের বিপক্ষে পাহাড়ে মানুষ ভোট দিয়েছে।
পাহাড়ের আসনগুলোতে ‘না’ ভোট জয়ী হলেও সামগ্রিকভাবে ‘হ্যাঁ’ বেশি পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন। অন্যদিকে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন।
‘না’ ভোট এগিয়ে থাকার যত কারণ
পাহাড়ের তরুণ প্রজন্ম ও নাগরিক সমাজের কথা, অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি গঠনে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলোর পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় অংশগ্রহণের বিষয়গুলো জুলাই সনদে আসা যৌক্তিক ছিল। সেই লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের জুলাই আন্দোলনে পাহাড়ি ছাত্র-তরুণেরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অনেকে নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনে সম্মুখসারির একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ডাকসুর নির্বাচিত সদস্য হেমা চাকমা। তিনি বলেছেন, পাহাড়ে মানুষ ‘না’ ভোট দিয়ে জুলাই সনদে নিজেদের অধিকারের কোনো কিছু প্রতিফলন না থাকায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ভাষার স্বীকৃতি-সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর ভাষাগুলোকে দেশের প্রচলিত ভাষা করার কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ সরকারি ভাষা নয়, বেসরকারি ভাষা হয়ে থাকবে।
হেমা চাকমা আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য সরাসরি প্রচারণা চালিয়েছে। এতে পাহাড়ি মানুষ ধারণা করেছেন তাঁরা সব সময় যাদের উগ্রবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন, জুলাই সনদে অধিকাংশই তাদের কথা বলা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন আসনে গণভোটে ‘না’ ভোট কেন বেশি পড়েছে জানতে চাইলে মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের সাবেক সহসভাপতি ও জুলাই আন্দোলনে বান্দরবানের সক্রিয় কর্মী উসিংম্যা মারমা নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় পাহাড়ের মুক্তির কথা লেখা একটি গ্রাফিতির ছবি জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে রাখার জন্য দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জাদুঘর কর্তৃপক্ষ রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানের মতে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে পাহাড়ের মানুষ সব সময় মনস্তাত্ত্বিক অতৃপ্তি ও শঙ্কার মধ্যে থাকে। এবারে রাষ্ট্র সংস্কারের জুলাই সনদে পাহাড়ের জন্য কী সংস্কার হবে তা বলা হয়নি। নতুন সরকারের শপথের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিয়োগে কী ধরনের সংস্কার হলো তা মানুষ দেখল। একধরনের সংস্কার ভীতি থেকে পাহাড়িরা গণভোটে ‘না’ ভোট দিয়েছে।