মুমূর্ষু ৮০ বছরের এক বৃদ্ধাকে নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে স্পিডবোটে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে আনা হয়। আজ সকালে
মুমূর্ষু ৮০ বছরের এক বৃদ্ধাকে নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে স্পিডবোটে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে আনা হয়।  আজ সকালে

ছড়িয়ে পড়েছে ভিডিও

নাকে অক্সিজেনের নল, মুমূর্ষু বৃদ্ধ মাকে নিয়ে স্পিডবোটে উত্তাল সাগর পাড়ি

নাকে অক্সিজেনের নল। পাশে সিলিন্ডার। স্পিডবোটে মুমূর্ষু ৮০ বছরের এক বৃদ্ধা শুয়ে আছেন স্বজনদের কোলে। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের ধাক্কায় কখনো ওপরে উঠছে নৌযানটি, আবার আছড়ে পড়ছে নিচে। এর মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি। বৃদ্ধাকে সাদা পলিথিনে ঢেকে কোনোরকমে বৃষ্টিতে বাঁচানোর চেষ্টা। এভাবেই গুরুতর অসুস্থ মাকে নিয়ে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামের পথে সাগর পাড়ি দিতে হয়েছে জাহাঙ্গীর কবিরকে।

আজ রোববার সকালে ধারণ করা সেই যাত্রার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সন্দ্বীপভিত্তিক একাধিক ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

ভিডিওটি দেখে অনেকে বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন জরুরি মুহূর্তে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিরাপদে চট্টগ্রামে নেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে।

মুমূর্ষু রওশন আরা বেগম সন্দ্বীপ পৌরসভার তালতলি বাজারসংলগ্ন ছটাই বাড়ির বাসিন্দা। তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর বলেন, তাঁর মা কয়েক বছর ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। শনিবার সন্ধ্যা থেকে তাঁর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। রোববার সকালে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল সন্দ্বীপ মেডিক্যাল সেন্টারে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

আজ বিকেলে জাহাঙ্গীর প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মা এখন চট্টগ্রাম শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) ভর্তি আছেন। তাঁর অবস্থা এখন কিছুটা ভালো হলেও আশঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টার দিকে মেডিক্যাল সেন্টার থেকে রওশন আরাকে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা। বেলা দুইটার দিকে চট্টগ্রামের ওই হাসপাতালে পৌঁছান। এর মধ্যে তাঁকে অক্সিজেন দিতে হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্বাভাবিক নৌযান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছিল।

জাহাঙ্গীর বলেন, জরুরি রোগী পারাপারের জন্য ঘাটে গিয়ে তাঁরা কোনো বিশেষ সহায়তা পাননি। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে জনপ্রতি ৩০০ টাকা ভাড়ায় একটি স্পিডবোটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন।

ভিডিওতে দেখা যায়, সাগর উত্তালের পাশাপাশি বৃষ্টিও হচ্ছিল। স্পিডবোটে রওশন আরাকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল। বৃষ্টি থেকে তাঁকে আড়াল করারও তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হলেও বাতাসে তা বারবার সরে গিয়ে তিনি বৃষ্টিতে ভিজে যান।

জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এমন দুর্ভাগ্য আমাদের, জরুরি চিকিৎসায় পারাপারের ব্যবস্থা নেই। উল্টো জীবনের শঙ্কা নিয়েই রোগী নিয়ে সাগরে ঝাঁপ দিতে হয়।’

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বশির আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এ সময় সাগর উত্তাল থাকে। ১ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত এই সতর্কসংকেত বহাল থাকবে।

সন্দ্বীপে জরুরি রোগী পারাপারের জন্য দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অচল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স ২০০৮ সাল থেকে গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে কেওড়াবাগানে স্থলভাগে পড়ে আছে। এক দিনের জন্যও সেটি রোগী পরিবহনে ব্যবহার করা হয়নি।

২০১৫ সালে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের আরও একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স সন্দ্বীপে দেওয়া হয়। সেটিও একবারের জন্যও চলাচল করেনি বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। বর্তমানে সেটি হারামিয়া ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পড়ে আছে।

মুমূর্ষু রোগী পারাপারে সি-অ্যাম্বুলেন্স কেন ব্যবহার করা হচ্ছে না জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস বলেন, ‘ওই দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স অচল হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। আমরা নতুন সি-অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জানিয়ে এখনো কোনো সাড়া পাইনি।’