শেরপুরের গারো পাহাড়ের পাদদেশে সবুজ ধানখেত। গত রোববার সকালে শ্রীবরদীর হালচাটি গ্রামে
শেরপুরের গারো পাহাড়ের পাদদেশে সবুজ ধানখেত। গত রোববার সকালে শ্রীবরদীর হালচাটি গ্রামে

বাতাসে একসঙ্গে দুলে ওঠে সারি সারি ধানগাছ, মনে হয় সবুজের ঢেউ

পড়ন্ত বিকেলে অদূরের গারো পাহাড় ঢেকেছে কুয়াশার চাদরে। এর পাদদেশে যত দূর চোখ যায়, কেবল সবুজ আর সবুজ। কোথাও সমতল জমি, কোথাও ছোট ছোট টিলা। মাঝে চলে গেছে সীমান্ত সড়ক। সবুজ ধানখেতের ফাঁকে ফাঁকে মাথা তুলেছে গাছপালা আর পাহাড়ি গ্রামের বসতি। দূর থেকে মনে হয়, প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে কেউ যেন ছবি এঁকেছে।

গত রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে। কর্ণঝোড়া, হালচাটি, ঝুলগাঁও, বালিজুড়ী, বাবলাকোনা, খারামুড়া, বড় গজনী, তাওয়াকুচা, রাংটিয়া, গোমড়া, সমশ্চূড়া, পোড়াবাড়ী, বাতকুচি, বারোমারী, দাওধারা-কাটাবাড়ী, তারানী, পানিহাটাসহ সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন আমন ধানের সবুজে ঢাকা।

ধানগাছে এখনো শিষ বেরোয়নি। ৩০ থেকে ৩৫ দিন আগে রোপণ করা ধানগাছগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠছে। গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানিতে সকালের আলো পড়ে তৈরি করছে অন্য রকম দৃশ্য। বাতাস এলেই সারি সারি ধানগাছ একসঙ্গে দুলে ওঠে। মনে হয়, সবুজের ঢেউ ছুটে যাচ্ছে পাহাড়ের পাদদেশজুড়ে।

পাহাড়ের ঢালে সবুজ, নিচে সবুজ ধানখেত, মাঝখানে সরু মেঠো পথ। কোনো পথ গিয়ে মিশেছে কৃষকের বাড়ির উঠানে, কোনোটি আবার ধানখেত পেরিয়ে চলে গেছে সীমান্তের দিকে। কৃষকেরা কেউ জমির আলে দাঁড়িয়ে ধানগাছ দেখছেন, কেউ নেমে পড়েছেন জমিতে। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ গাছের অবস্থা দেখে বোঝার চেষ্টা করছেন ফলন কেমন হতে পারে।

শ্রীবরদীর হালচাটি গ্রামের কিষানি শেফালি মাংমা বলেন, মাসখানেক হলো ধানের চারা চারা রোপণ করেছেন। সময়মতো বৃষ্টি হয়েছে। ধানগাছও ভালো হয়েছে। সীমান্তের কৃষক সব সময় এ ফসল নিয়ে স্বপ্ন দেখেন।

বাতাস এলেই সারি সারি ধানগাছ একসঙ্গে দুলে ওঠে। গত রোববার দুপুরে ঝিনাইগাতীর বড় গজনি গ্রামে ছবি: প্রথম আলো

ধারদেনা করে ধান, সেই ধানেই চলে সংসার

ঝিনাইগাতীর বড় গজনী এলাকার ৩৫ বছর বয়সী কিষানি শান্তা চিচামের ৬০ শতাংশ জমিতেও এখন কেবল সবুজ ধানগাছ। ধারদেনা করে জমিটিতে ধান লাগিয়েছেন তিনি। ধানগাছে এখনো শিষ আসেনি। তবে গাছের বাড়ন্ত দেখে আশাবাদী শান্তা।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরের গারো পাহাড়সংলগ্ন শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৭ হাজার ৭৫৭ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীবরদীতে ৩ হাজার ৫০১ হেক্টর, ঝিনাইগাতীতে ২ হাজার ১৪০ হেক্টর এবং নালিতাবাড়ীতে ২ হাজার ১১৬ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে।

সীমান্তের গ্রামগুলোয় সাধারণত ধানের ফলন ভালো হয় জানিয়ে শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড়ি এলাকায় অনেক কৃষক একটু দেরিতে চারা রোপণ করেন। তাই এসব এলাকার ধানও অপেক্ষাকৃত পরে কাটতে হয়। নিয়মিত সার, কীটনাশক ও প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ায় এবার ধানগাছ ভালো হয়েছে।

প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠছে ধানগাছ। নালিতাবাড়ীর সমশ্চুড়া গ্রাম থেকে

আছে বন্য হাতির দুশ্চিন্তাও

গারো পাহাড়ের ঢালে এখন প্রকৃতি যেন কৃষকের পক্ষে। বৃষ্টি হয়েছে, জমি সবুজ হয়েছে, ধানগাছ শক্ত হচ্ছে। কিন্তু এই সবুজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কৃষকের পুরোনো দুশ্চিন্তা—বন্য হাতি।

এখনো ধানের শিষ বেরোয়নি। মাঠে পাকা ধানের গন্ধও ছড়ায়নি। কিন্তু কৃষকেরা জানেন, কয়েক সপ্তাহ পর যখন সবুজ ধানখেত ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে উঠবে, তখন পাহাড় থেকে নেমে আসতে পারে বন্য হাতির পাল। সেই আশঙ্কা মাথায় রেখেই তাঁরা জমির পরিচর্যা করছেন। তবু দুশ্চিন্তার চেয়ে এখন কৃষকদের চোখে বড় হয়ে উঠেছে স্বপ্ন।