জাল বিএড সনদ দিয়ে ছয় বছর প্রধান শিক্ষক পদে

পাস না করেও বিএড সনদ দিয়ে ছয় বছর ধরে লক্ষ্মীপুরের একটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ কামাল হোসেন। এর আগে আরেকটি বিদ্যালয়ে ১৪ বছর একই সনদ দেখিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০১ সালে বিএড পরীক্ষা দিলেও তিনি পাস করেননি।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মুনছুর আহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের বিএড সনদপত্র জাল হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি
ছবি: সংগৃহীত

বিএড (ব্যাচেলর অব এডুকেশন) পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন, তবু জাল সনদ ব্যবহার করে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মুনছুর আহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি করে যাচ্ছেন মোহাম্মদ কামাল হোসেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত রেকর্ডে মিলেছে এমন তথ্য। তিনি এ বিদ্যালয়ে ছয় বছর ধরে প্রধান শিক্ষক পদে রয়েছেন। এর আগে একই সনদ দেখিয়ে ১৪ বছর অন্য একটি বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিএড পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ২০০১ সালে। তাঁর রোল নম্বর ২৬৪০, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৩৭৬৫৫। পরীক্ষায় অংশ নিয়েও তিনি পাস করেননি। অর্থাৎ চাকরির জন্য দুটি বিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর বিএড সনদ জাল।

সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বাশিস) সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিল এ বিষয়ে অভিযোগ তোলার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। মোহাম্মদ কামাল হোসেনের বিএড সনদ যাচাইয়ের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান তিনি। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হয় মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিএড পরীক্ষা দিলেও তাতে উত্তীর্ণ হননি।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্যমতে, জাল সনদ ব্যবহার করে সরকারি বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি অনুযায়ী জালিয়াতি, প্রতারণা ও ভুয়া সনদ ব্যবহারের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা হতে পারে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী, জাল সনদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বাতিল, চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং সরকারি কোষাগার থেকে নেওয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে।

মো. ইব্রাহিম খলিল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। একজন শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারিনি। এ কারণেই তাঁর বিএড সনদটি জাল কি না, তা যাচাইয়ের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাই। অকৃতকার্য হয়েও তিনি জাল বিএড সনদ নিয়ে চাকরি করছেন। এটা অন্যায়।’

বিষয়টি জানতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ফরিদ হোসেন খানের সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তিনি গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ডে মোহাম্মদ কামাল হোসেনের বিএড সনদ জাল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আগেই এ–সংক্রান্ত আমার সই করা চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থার নেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।’

আইন কী বলে

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্যমতে, জাল সনদ ব্যবহার করে সরকারি বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি অনুযায়ী জালিয়াতি, প্রতারণা ও ভুয়া সনদ ব্যবহারের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা হতে পারে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী, জাল সনদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বাতিল, চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং সরকারি কোষাগার থেকে নেওয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র মিত্র বলেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক হতে হলে বিএড ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি বিএড ডিগ্রি অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘কামাল হোসেন নামের একজন শিক্ষক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সার্টিফিকেট জাল করেছেন। এ–সংক্রান্ত চিঠির কপিও পেয়েছি। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

গৌতম চন্দ্র মিত্র আরও বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে বিএড সনদটি জাল, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রধান শিক্ষক পদে আর থাকতে পারবেন না। এ ছাড়া এ পদে থেকে সরকার থেকে নেওয়া সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ফেরত দিতে হবে।

শিক্ষা কার্যালয়ের সূত্রে জানা যায়, মোহাম্মদ কামাল হোসেন ছয় বছর ধরে মুনছুর আহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি ১৪ বছর পালেরহাট পাবলিক হাইস্কুলেরও সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। উভয় ক্ষেত্রেই নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের সময় বিএড ডিগ্রি থাকার তথ্য দেখিয়েছেন তিনি।

পালেরহাট পাবলিক হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বেলায়েত হোসেন খান জানান, কামাল হোসেন প্রায় ১৪ বছর তাঁদের বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে এমপিওভুক্ত হন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জাল সনদের অভিযোগটি সঠিক নয় বলে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাল সনদ ব্যবহার করে প্রধান শিক্ষক পদে থাকার বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি নতুন যোগদান করেছি। অভিযোগটি সত্য হলে চরম অন্যায় হয়েছে। বিষয়টি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা করা হবে।’