পুলিশের হাতে আটক আসাদুল আলম
পুলিশের হাতে আটক আসাদুল আলম

র‍্যাব সদস্যকে ছুরিকাঘাতের পর শিশুকে জিম্মি করে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন মাদক ব্যবসায়ী

বাসার দরজা ছিল খোলা। বিছানায় খেলছিল দুই বছরের এক ছেলেশিশু। পাশেই শিশুটির মা আরেক নারীর সঙ্গে খোশগল্প করছিলেন। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে দৌড়ে ঘরটিতে ঢোকেন এক মাদক ব্যবসায়ী। তাঁর হাতে চাকু। ঘরে ঢুকেই শিশুর গলায় চাকু ধরে মাদক ব্যবসায়ী হুমকি দেন, ‘কেউ চিল্লাবি না, চিল্লাইলেই পুছ দিমু।’

আজ শুক্রবার বেলা পৌনে একটার দিকে সিলেট নগরের তোপখানা এলাকার একটি বাসায় এমন ঘটনা ঘটে। মহানগরের কোতোয়ালি মডেল থানা থেকে বাসাটির দূরত্ব প্রায় ৪০০ মিটার। এর আগে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ওই মাদক ব্যবসায়ী এক র‍্যাব সদস্যকে ছুরিকাঘাত করেন। পরে বেলা দেড়টায় র‍্যাবের ওই সদস্য মারা যান।

পুলিশ জানিয়েছে, দুপুরে কিনব্রিজ এলাকায় কয়েকজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী মাদক সেবন ও বিক্রি করছিলেন। তাঁরা স্থানীয়ভাবে ছিনতাইকারী হিসেবেও পরিচিত। পুলিশের একটি টহল দল তাঁদের দেখে ধাওয়া দেয়। এ সময় মাদক ব্যবসায়ী চক্রের সদস্যরা দৌড় দেন। আসাদুল আলম ওরফে বাপ্পী (২২) নামের এক মাদক ব্যবসায়ী তখন তোপখানা এলাকার রাস্তার দিকে দৌড় দেন। ওই রাস্তায় সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে তখন ব্যক্তিগত কাজে অবস্থান করছিলেন র‍্যাবের কনস্টেবল ইমন আচার্য (২৮)। এ সময় তিনি ওই মাদক ব্যবসায়ীকে ঝাপটে ধরেন। সঙ্গে সঙ্গে আসাদুল ওই র‍্যাব সদস্যের বুকের বাঁ পাশে চাকু দিয়ে আঘাত করেন। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় ইমনকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে বেলা দেড়টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

পুলিশ আরও জানায়, র‍্যাব সদস্যকে ছুরিকাঘাত করে আসাদুল পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ সদস্যরাও তাঁর পিছু নেন। এ সময় আসাদুল তোপখানা এলাকার একটি বাসায় ঢুকে পড়ে এক শিশুর গলায় চাকু ধরে ওই পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে পুলিশ সদস্যরা কৌশলে তাঁকে আটক করেন। এ সময় আসাদুলের কাছে থাকা চাকুটিও জব্দ করেছে পুলিশ।

ছুরিকাঘাতে আহত র‍্যাব সদস্য ইমন আচার্য

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির প্রথম আলোকে জানান, আসাদুল ওই বাসায় ঢুকে শিশুর গলায় ছুরি ধরেন। এ দৃশ্য দেখে ভয়ে সেখানে থাকা দুই নারী চিৎকার শুরু করেন। চিৎকার-আর্তনাদ শুনে আশপাশের ঘরে থাকা নারীরাও ছুটে আসেন। তখন এখানকার বাড়ির পুরুষেরা কাজে ছিলেন। যেহেতু পুলিশ ধাওয়া দিয়েছিল আসাদুলকে, তাই কিছুক্ষণ পর পুলিশের আট সদস্যের একটি দলও সেখানে পৌঁছে যায়।  

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আরও বলেন, আসাদুল কারও কথাই শুনছিলেন না। তিনি কিছুক্ষণ পরপর ভয় দেখাচ্ছিলেন, শিশুটির গলা চাকু দিয়ে কেটে ফেলবে। তাঁকে পুলিশ সদস্যরা বারবার নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে পুলিশের এক সদস্য চুপিসারে ওই মাদক ব্যবসায়ীর চাকু ধরা হাতে লাঠি দিয়ে জোরে আঘাত করেন। এ সময় আঘাত পেয়ে আসাদুল শিশুটিকে ছেড়ে দিলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটিকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে আসাদুলকে দ্রুত আটক করে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, আসাদুলকে আটকের সময় ধস্তাধস্তির সময় পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক মো. জামাল মিয়া, কনস্টেবল হাকিম, উজ্জ্বলসহ কয়েকজন আহত হন। এ সময় আসাদুল আলমও আহত হন। সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

যে বাসায় আসাদুল ঢুকে শিশুর গলায় ছুরি ধরেছিলেন, সেখানে এক দিনমজুর পরিবার ভাড়ায় থাকেন। ভয়ে তাঁরা নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাইছেন না। পুলিশকে তাঁরা অনুরোধ করেছেন, যেন সাক্ষী হিসেবে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা না হয়। পুলিশ বিষয়টি বিবেচনা করছে।

এদিকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আটক হওয়া আসাদুল আলম পুলিশের হেফাজতেই আছেন। পুলিশ জানিয়েছে, আগামীকাল শনিবার আসাদুলকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে। অন্যদিকে নিহত ইমন আচার্যের মরদেহ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে। আগামীকাল ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, নিহত র‍্যাব সদস্য ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পশ্চিম ধলই গ্রামে। তাঁকে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হবে। এ ঘটনায় আটক হওয়া আসাদুল আলমের বাসা নগরের কাজিরবাজার মোগলটুলা এলাকায়। তিনি একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারী। অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলাও হয়েছে।