কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির

কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে ৯ বছর

খাদ্যসহায়তার টানাপোড়েন ও অনিশ্চিত প্রত্যাবাসনের ‘গোলকধাঁধায়’ রোহিঙ্গারা

আজ ২০ জুন, বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি প্রতিবছর আসে, কিন্তু কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার আশ্রয়শিবিরগুলোয় বসবাসকারী ১৪ লাখ রোহিঙ্গার জীবনে এই দিনটি কোনো নতুন আশার বার্তা নিয়ে আসে না। বরং খাদ্যসহায়তার টানাপোড়েন ও অনিশ্চিত প্রত্যাবাসনের ‘গোলকধাঁধায়’ স্বজন হারানো আর জন্মভূমি ছাড়ার স্মৃতিগুলো এই দিনে আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

উখিয়ার লম্বাশিয়া, কুতুপালং, বালুখালী, মধুরছড়া, টেকনাফের নয়াপাড়া, শালবাগান, জাদিমুরা আশ্রয়শিবির ঘুরে রোহিঙ্গাদের মুখে কেবল শোনা যায় হতাশার কথা।

বর্তমানে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরের কয়েক মাসে। গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে রাখাইন রাজ্য থেকে আরাকান আর্মির অত্যাচার–নির্যাতনের শিকার হয়ে আশ্রয়শিবিরে পালিয়ে আসে আরও ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা।

খাদ্যসহায়তার সংকট

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, তহবিলের টানাপোড়েনের কারণে গত ১ এপ্রিল থেকে ‘নিড-বেসড’ বা প্রয়োজনভিত্তিক রেশন দেওয়া হচ্ছে। পরিবারগুলোর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে মাথাপিছু ৭, ১০ ও ১২ ডলারের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

টেকনাফের লেদা আশ্রয়শিবিরের রহিমা খাতুন (৫৫) বলেন, এই ডলারে কিছুই হয় না। মাসের অর্ধেক যেতেই চাল-ডাল শেষ হয়ে যায়। বাইরের কোনো কাজ করার সুযোগ নেই, নেই কোনো উপার্জনের পথ। এখন বিদেশ থেকে পাঠানো আত্মীয়দের টাকার ওপর টিকে থাকা পরিবারগুলোই কোনোমতে দুবেলা খেতে পাচ্ছে। বাকিদের অবস্থা বর্ণনাতীত।

শরণার্থী শিবিরের সবচেয়ে করুণ চিত্রটি সম্ভবত শিশুদের। প্রায় ছয় লাখ শিশু-কিশোর এখানে বেড়ে উঠছে কোনো খেলার মাঠ, পার্ক কিংবা শিক্ষার সুযোগ ছাড়াই। ক্যাম্পের ঘিঞ্জি পরিবেশে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঈদুল ফিতর বা আজহার মতো উৎসবেও শিশুদের ভাগ্যে জোটে না নতুন পোশাক। অপুষ্ট এই শিশুরা জানে না কেন তারা এখানে বন্দী, কেন তাদের মা-বাবা রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটান। অপুষ্টির কারণে শিশুদের বড় একটি অংশ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে রয়েছে।

প্রত্যাবাসন কবে

উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবির। পাহাড়ের ঢালুতে গাদাগাদি করে গড়ে তোলা ত্রিপলের বসতি। শিবিরের সরু গলির পাশ দিয়ে হাঁটলে বাতাসের গন্ধেই বোঝা যায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মাত্রা। এখানেই পরিবার নিয়ে থাকছেন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু-টাউনশিপের সিকদার পাড়ার বাসিন্দা সাব্বির আহমদ। ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর নাফ নদী পার হয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন তিনি।

সব্বির আহমদ (৫৩) দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রথম আলোকে বলেন, ৯ বছর পার হলো, কিন্তু ফিরে যাওয়ার কোনো পথ খুলল না। রাখাইনে এখন আর জান্তা নেই, আরাকান আর্মির দখলে এলাকা। কিন্তু পরিস্থিতি আগের চেয়েও জটিল। সেখানে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ নাই। ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অস্থিরতায় ভুগছেন তিনি। আশ্রয়শিবিরে মাদক চোরাচালান, অপহরণ ও খুনের ঘটনায় জনজীবন অস্থির করে তুলছে।

প্রত্যাবাসন নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন নেই উল্লেখ করে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএইচপিএস) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তরুণ প্রজন্ম মাদক ও সন্ত্রাসের দিকে ঝুঁকছে। অনেক কিশোর অপরাধী চক্রের টোপে পড়ছে, এমনকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর দিকেও পা বাড়াচ্ছে। নারী ও শিশুরা পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে।

রোহিঙ্গারা বলছেন, রাখাইন রাজ্যের বর্তমান চিত্র আরও ভয়াবহ। মংডু ও বুচিডংয়ের মতো এলাকাগুলো বর্তমানে যুদ্ধের ময়দান। জান্তা ও আরাকান আর্মির লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে গত দেড় বছরে আরও ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ ও নির্যাতনের খবর প্রতিদিন শিবিরের বাসিন্দাদের আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়। যখন নিজের দেশেই রোহিঙ্গার অস্তিত্ব বিপন্ন, তখন প্রত্যাবাসন কেবল আশ্বাসই মনে করছেন তাঁরা।

রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো মিয়ানমার জান্তার গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ( আইসিজে) বিচারাধীন। মামলার প্রতিটি শুনানি রোহিঙ্গাদের মনে কিছুটা আশার আলো জ্বালালেও, মাঠপর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তার নতুন করে সংঘাতের কারণে প্রত্যাবাসনের পথ প্রায় রুদ্ধ।

গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে আরাকান আর্মির অত্যাচার–নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসে আরও ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা

নিরাপত্তার সংকট ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি

শিবিরের পরিবেশ দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে উল্লেখ করে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা জালাল আহমদ বলেন, বর্ষাকালে পাহাড়ধস এবং শুষ্ক মৌসুমে আগুনের আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।

আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকার রাখাইনের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আমাদের অগ্রাধিকার, কিন্তু রাখাইনের পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া রোহিঙ্গাদের সেখানে পাঠানো আত্মঘাতী হতে পারে। আমরা আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে কথা বলছি, কিন্তু তহবিলসংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।’

রোহিঙ্গা নেতাদের ভাষ্য, শিবিরের অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তি পেতে রোহিঙ্গারা বেছে নিচ্ছে জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ-সমুদ্র। আদম পাচারকারী চক্রগুলোর প্রলোভনে পড়ে বা স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন শত শত রোহিঙ্গা। প্রতি মাসে কয়েক দফায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে শতাধিক রোহিঙ্গা উদ্ধার হচ্ছে।

প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে বহু রোহিঙ্গার সলিলসমাধি ঘটছে, তবু এই স্রোত থামছে না। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেক নারী ও শিশু পাচারের শিকার হচ্ছে। দারিদ্র্য ও ভবিষ্যতের ঘোর অন্ধকার তাদের এই মরণফাঁদে পা দিতে বাধ্য করছে। যারা ফিরে আসছে, তারা হারাচ্ছে সর্বস্ব।

৯ বছর আগে স্বামী ও দুই ভাইকে হারানো কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা আলমাস খাতুন বলেন, ‘আমরা ভিক্ষা চাই না, আমরা আমাদের দেশ চাই। সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার চাই।’