পানিতে ডুবে মৃত্যু
পানিতে ডুবে মৃত্যু

পানিতে ডুবে চার জেলায় ৭ জনের মৃত্যু, দুজন নিখোঁজ, সবাই শিশু-কিশোর

পানিতে ডুবে চার জেলায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচটি শিশু, দুজন কিশোর। রোববার বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। দুজন করে মৃত্যু হয়েছে ময়মনসিংহ, নীলফামারী ও পঞ্চগড়ে। একজন মারা গেছে কুষ্টিয়ায়। এছাড়া লালমনিরহাট জেলা সদরে ধরলা নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হয় দুই ভাই। তাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবির সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বেলা দুইটার দিকে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশু দুটির নাম মো. হোসাইন (৬) ও মারিয়াম (৫)। তারা চাচাতো ভাই-বোন। হোসাইনের বাবার নাম আনোয়ার হোসেন ও মারিয়ামের বাবা মো. সাকিব। তাঁরা রঘুনাথপুর মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

পুলিশ জানায়, উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নে রঘুনাথপুর মধ্যপাড়া গ্রামে বাড়ির পাশে খেলা করার সময় অসাবধানতাবশত পুকুরে পড়ে যায় হোসাইন ও মারিয়াম। পরে আত্মীয়স্বজনেরা তাদের খোঁজাখুঁজি করেও পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে পুকুরের পানিতে একজন ভেসে ওঠে। পরে পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে অন্য শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন, বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের উত্তর সোনাখুলী গ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলো ওই গ্রামের রবিউল ইসলামের মেয়ে রুপাইয়া আক্তার (৪) এবং আউয়াল হোসেনের মেয়ে আশফিকা আক্তার (৪)। তারাও সম্পর্কে চাচাতো ভাই–বোন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা যায়, রোববার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে খেলছিল দুই শিশু। একপর্যায়ে তারা সবার অগোচরে পুকুরে গোসল করতে নামে। কিন্তু সাঁতার না জানায় দুজনই গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। বেশ কিছু সময় ধরে শিশুদের দেখতে না পেয়ে পরিবারের লোকজন তাদের খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে পুকুরের পানিতে তাদের ভেসে থাকতে দেখে দ্রুত উদ্ধার করা হয়। পরে নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে দুই শিশুকেই মৃত ঘোষণা করা হয়।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, একই বাড়ির দুই ভাইয়ের দুটি অবুঝ শিশুর এমন অকালমৃত্যুতে এলাকায় স্তব্ধতা নেমে এসেছে।

এ বিষয়ে কথা বললে ডিমলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দিবাকর অধিকারী বলেন, এখন পর্যন্ত বিষয়টি তাঁদের জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পঞ্চগড়ে গোসল করতে নেমে পুকুরের পানিতে ডুবে আবদুর রহিম (১৪) ও রাজিব হোসেন ওরফে লাবিব (১৬) নামের দুই কিশোর মারা গেছে। রোববার দুপুরের পঞ্চগড় সদর উপজেলার সাতমেরা ইউনিয়নের দশমাইল-দক্ষিণ সাহেবীজোত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আবদুর রহিম সাতমেরা ইউনিয়নের শিতলী হাসনা এলাকার প্রয়াত জাকির হোসেনের ছেলে এবং রাজিব হোসেন একই ইউনিয়নের সাহেবীজোত এলাকার আশরাফুল ইসলামের ছেলে। নিহত আবদুর রহিমের বাবা জাকির হোসেন প্রায় দুই বছর আগে নদীতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন।

আবদুর রহিম দশমাইল নুরানি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র ছিল। এ ছাড়া রাজিব হোসেন একই মাদ্রাসা থেকে হাফেজি পড়া শেষ করে তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকার একটি মাদ্রাসায় হেফজ শুনানি করছিল বলে জানা গেছে।

স্থানীয় লোকজনের বরাত দিয়ে সাতমেড়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মিন্টু কামাল ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজিজুল ইসলাম বলেন, দুপুরে মাদ্রাসা ছুটির পর পঞ্চগড়ের সদর উপজেলার দক্ষিণ সাহেবীজোত দশমাইল এলাকার একটি পুকুরে গোসল করতে নামে আবদুর রহিম ও রাজিব। সাঁতার না জানায় পুকুরের গভীর পানিতে তলিয়ে যায় তারা। বিষয়টি স্থানীয় লোকজন বুঝতে পেরে পুকুরে নেমে তাদের খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে পুকুরের গভীর পানির নিচ থেকে তাদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

পঞ্চগড় সদর থানার ওসি আশরাফুল ইসলাম পুকুরের পানিতে ডুবে দুই মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দুই ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।

রোববার দুপুরে লালমনিরহাট জেলা সদরের মোগলহাট এলাকায় ধরলা নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হয় দুই ভাই। তাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবির সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন।

নিখোঁজ দুই ভাই মোগলহাট বাজার এলাকার মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের ছেলে শাওন (১৪) ও সাব্বির (১৫)। শাওন মোগলহাট উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সাব্বির একই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রোববার বেলা দুইটার দিকে শাওন, সাব্বির ও তাদের বন্ধু মেহেদী মোগলহাট বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় ধরলা নদীতে গোসল করতে নামে। একপর্যায়ে তীব্র স্রোতে তারা ভেসে যেতে থাকে। মেহেদী কোনোরকমে সাঁতরে তীরে উঠলেও শাওন ও সাব্বির তলিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন নদীতে নেমে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চালান। খবর পেয়ে লালমনিরহাট ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। এ সময় মোগলহাট বিওপির কয়েকজন বিজিবি সদস্যও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত নিখোঁজ দুই ভাইয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি।

লালমনিরহাট সদর থানার ওসি সাদ আহমেদ বলেন, খবর পেয়ে সদর থানা–পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত নদীতে নিখোঁজ দুই ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

কুষ্টিয়ায় পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর স্বজনদের আহাজারি

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে নানাবাড়ি বেড়াতে এসে পানিতে ডুবে সাউবান (৬) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় সিফাত (৫) নামের আরও এক শিশু আহত হয়ে বাড়িতে চিকিৎসাধীন। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার জগন্নাথপুর হাসিমপুর ইকোপার্ক–সংলগ্ন পদ্মা নদীর পাড়ে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত সাউবান খোকসার শিমুলিয়া ইউনিয়নের বিলজানি এলাকার জাহিদ হোসেনের ছেলে ও কুমারখালীর হাসিমপুর এলাকার আজিজুল শেখের নাতি। আর আহত সিফাত হাসিমপুরের জালাই সরদারের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিশু সাউবান পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় থাকত। শনিবার বিকেলে সে তার মায়ের সঙ্গে নানাবাড়িতে বেড়াতে আসে। রোববার সাউবান ও সিফাত খেলতে বের হয়। এরপর হাসিমপুর পদ্মা নদীর পাড়ে পানিতে এক জোড়া স্যান্ডেল ও সিফাতকে ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন সিফাতকে উদ্ধার করে হাসিমপুর বাজারে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে সাউবানকে না পেয়ে তাঁরা পদ্মা নদীর কোলে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর একই স্থান থেকে সাউবানকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কুমারখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, নানাবাড়িতে বেড়াতে নদীর কোলের পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত আরেক শিশু বাড়িতে চিকিৎসাধীন। কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, প্রতিনিধি, নীলফামারী , লালমনিরহাট ও পঞ্চগড়]