‘ঘুষ.সাইটের’ উদ্যোক্তা শাহেদ শরীফ আহমেদের সঙ্গে কথা বলছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কার্যালয়ে
‘ঘুষ.সাইটের’ উদ্যোক্তা শাহেদ শরীফ আহমেদের সঙ্গে কথা বলছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কার্যালয়ে

‘ঘুষ.সাইট’

কিশোর শাহেদের খোঁজ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পরিকল্পনা শুনলেন ময়মনসিংহ সিটি প্রশাসক

ঘুষের অভিযোগ জানাতে ওয়েবসাইট তৈরি করে আলোচনায় আসা ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদের খোঁজ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। পাশাপাশি আজ মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে নিজ কার্যালয়ে শাহেদকে ডেকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন। সেখানে শাহেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্রয়াত শিক্ষিকা মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে পদে পদে ঘুষ দাবির বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতে গত ২১ আগস্ট ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে শাহেদ শরীফ। সেখানে ঘুষের অভিযোগ জানাতে থাকেন অসংখ্য মানুষ। সোমবার প্রথম আলোতে এ খবর প্রকাশের পর দুপুরেই শাহেদের বাবাকে ডেকে পেনশনের কাগজপত্র দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং অনিয়মে জড়িত দুই কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়। গতকাল সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও শাহেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

শাহেদের ঘুষ.সাইটে আজ মঙ্গলবার বিকেল চারটা পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৬৬৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা।

শাহেদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ময়মনসিংহ সিটি প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে থাকেন এমন একজন সোমবার রাতে প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদটি তাকে পাঠান। আজ কিশোর শাহেদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ঘুষ.সাইট নিয়ে তাঁর বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাবেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এখনো কোনো বিশেষ নির্দেশনা আসেনি। বিষয়টি পাঠানোর পর হয়তো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। সরকারের গবেষণা বা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকেও এ কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।

‘ঘুষ.সাইট’ উদ্যোগটি খুবই ভালো লেগেছে উল্লেখ করে মো. রুকুনোজ্জামান বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কিছু করতে চাওয়া এমন তরুণদের উৎসাহিত করা দরকার। শাহেদের মধ্যে আমরা সেই আগ্রহ ও স্পিডটা দেখেছি। সারা বাংলাদেশে জেনারেশন জেডের (জেন-জি) অনেক ছেলেমেয়ে আছে, যারা দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে চায়।’

এদিকে ঘুষ.সাইট সাড়া ফেলায় উচ্ছ্বসিত শাহেদ শরীফ আহমেদ। সিটি প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মূলত ঘুষ.সাইটের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সরকার কীভাবে এ উদ্যোগকে সহযোগিতা করতে পারে, তা নিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর মূল বার্তা হলো—সরকারের কাছ থেকে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা পেলে উপকৃত হবে এবং এ জন্য কৃতজ্ঞ থাকবে।

শাহেদ শরীফ বলে, ‘আমি এখনো শিক্ষার্থী। পাশাপাশি ঘুষ.সাইট ও আমার পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ, কাজের চাপ কিছুটা কমানোর ক্ষেত্রে যদি কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা বা সরকারি পর্যায়ের স্বীকৃতি পাওয়া যায়, তাহলে আমার জন্য কাজটি এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে। এতে আমার লেখাপড়ার ওপরও চাপ কমবে।’

সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানায় শাহেদ শরীফ। সে বলে, ‘ঘুষ.সাইট নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং এটি কীভাবে সামনে এগিয়ে নিতে চাই, তা জানতে চেয়েছেন। এ ছাড়া আমার মায়ের পেনশনের বিষয়টিও জানতে চেয়েছেন। আজ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বৈঠকটিও ভালো হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।’

শাহেদের অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন

শাহেদ শরীফের মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা পেতে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়। তিন সদস্যের এই কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের এক আদেশে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান করা হয়েছে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষ কুমার তরফদার ও মো. সাদ্দাম হোসেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান সিকদার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ঘুষ.সাইট নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখতে কমিটি করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আজ মঙ্গলবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে।

তদন্ত কমিটির নোটিশে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আজমতপুর পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমেনা খাতুনের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী মো. শরীফুল ইসলাম কেন যৌথ বিমা, কল্যাণ ভাতা ও দাফন-কাফনের অনুদান পাননি এবং এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়নি—এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নোটিশে তদন্ত কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র, সাক্ষ্য-প্রমাণসহ নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।