কক্সবাজারের মহেশখালী

নড়বড়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও বেড়িবাঁধ নিয়ে শঙ্কায় ধলঘাটার ১৫ হাজার মানুষ

জোয়ারের পানিতে ধলঘাটার অস্থায়ী বেড়িবাঁধ তলিয়ে যাচ্ছে। গতকাল সোমবার দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

বৈরী পরিবেশে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বঙ্গোপসাগর উত্তাল রয়েছে। এর ওপর পূর্ণিমার প্রভাব চলছে। জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলে আঘাত হানছে। এতে কক্সবাজারের মহেশখালীর ধলঘাটা ইউনিয়নের ১২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৫ কিলোমিটার নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বাঁধ উপচে জোয়ারের পানিতে লোকজনের ঘরবাড়ি প্লাবিত হচ্ছে। এতে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে তৈরি বাঁধ জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বাঁধের পাশেই জরাজীর্ণ ঘরবাড়ি। বেশির ভাগ ঘরের ছাউনি পলিথিনের। একসময় সাগরে মাছ আহরণ ও মাঠে লবণ উৎপাদন করে এই ইউনিয়নের ৯০ শতাংশ মানুষের সংসার চলত। এখন সাগরে মাছ নেই, লবণ উৎপাদনও বন্ধ।

স্থানীয় ধলঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ ঝড়-জ্বলোচ্ছাসের মতো দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে আছে। এর মধ্যে বছর দুয়েক আগে ইউনিয়নের ১২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৫ কিলোমিটার সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। তখন বর্ষার প্লাবন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ভাঙ্গা বাঁধের গোড়ায় জিও ব্যাগ ও মাটি ফেলে অস্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু এই বাঁধ দিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পাঁচ কিলোমিটারের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ চলছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না।

ইউনিয়নের নাসির মোহাম্মদ ডেইল গ্রামের বাসিন্দা আবু ছৈয়দ (৬৮) বলেন, ‘১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বাবা, তিন ছেলে ও এক বোনকে হারিয়েছিলাম। ৩২ বছরেও সেই স্মৃতি ভুলতে পারিনি। এখন নতুন করে কাউকে হারাতে চাই না। আমরা বেড়িবাঁধ চাই, নিরাপদে বসবাসের সুযোগ চাই।’
ইউনিয়নের সরইতলার বাসিন্দা আকতার হোছাইন (৫৫) বলেন, বিভিন্ন সময় দুর্যোগের কবলে পড়ে সরইতলার অন্তত ৩০০ পরিবারের ঘরবাড়ি সাগরে বিলীন হয়েছে। গৃহহীন অনেকেই জেলা শহর, চকরিয়া ও মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। এখন আবার যদি বড় কোনো দুর্যোগ আসে তাহলে প্রচুর মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে।

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সব কটি আশ্রয়কেন্দ্রে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে

ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্র

আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিসিডিবি উপকূলীয় এই ইউনিয়নে ১০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে দেয়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সব কটি আশ্রয়কেন্দ্রে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

ইউনিয়নের নাসির মোহাম্মদ ডেইল আশ্রয়কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল ধরেছে। দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। সিড়ি ও দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। বেশ কয়েকটি পিলার ভেঙে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড় কিংবা ঝোড়ো হাওয়ায় ভবনটি যেকোনো মুহূর্তে ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় লোকজন।

ইউনিয়নের বনজামিরা, সরইতলা, উত্তর সুতুরিয়া ও দক্ষিণ মুহুরিঘোনা এলাকার আরও চারটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থাও অনেকটা এ রকম।

নাসির মোহাম্মদ ডেইল গ্রামের বাসিন্দা কালা মিয়া (৭০) বলেন, দুর্যোগের সংকেত পড়লেই পরিবার নিয়ে পাশের কালারমারছড়া ইউনিয়নের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। এলাকার আশপাশে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থা ভালো নয়। আবার আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দখল করে রেখেছেন বলে তিনি দাবি করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, শিগগিরই জরাজীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সংস্কার করা হবে। পাশাপাশি অবৈধ দখলে থাকা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।